প্রকাশকদের বিস্তর অভিযোগ

0
173

করোনা পরিস্থিতিতে অনেকেই আশঙ্কা করলেও জমজমাট বইমেলা হচ্ছে। কিন্তু বিশাল আয়তনের কারণে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পূর্ব অংশে যেসব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্যাভিলিয়ন ও স্টল বরাদ্দ পেয়েছেন তাদের বই বিক্রি খুব একটা ভালো নয় বলে অভিযোগ শুরু থেকেই।

মেলার ‘ভাসানচর’ হিসাবে খ্যাত ওই এলাকায় পাঠকের আনাগোনা কম। পাশাপাশি মেলা প্রাঙ্গণের সামনে ও মাঝখানে প্রচুর জায়গা খালি রাখা, অপরিকল্পিতভাবে লিটল ম্যাগ চত্বর, প্রয়োজনের তুলনায় অধিক খাবারের দোকান, অনাড়ম্বর শিশুচত্বর, নান্দনিকতার অভাব, পাইরেটেড বই বিক্রিসহ নানা বিষয়ে বেশ কয়েকজন প্রকাশক বিস্তর অভিযোগ করেছেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মেলাকে সার্বিকভাবে বিবেচনায় আনার বিষয়ে তাগিদ দিয়েছেন।

আগামী প্রকাশনীর প্যাভিলিয়নটি এবার মেলার ‘ভাসানচর’ খ্যাত পূর্ব দিকে পড়েছে। প্রকাশনাটির প্রধান ও জ্যেষ্ঠ প্রকাশক ওসমান গণি যুগান্তরকে বলেন, সত্যি বলতে স্বাধীনতার ৫০ বছরেও অমর একুশে বইমেলার জন্য সুন্দর একটি পরিকল্পনা আমরা করতে পারিনি। এবার কিছু দিক থেকে বেশ ন্যক্কারজনক অবস্থা। মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মূল মাঠে অনেক জায়গা খালি। অথচ একেবারে পূর্বদিকে ‘ভাসানচর’ সৃষ্টি হলো। আমি মনে করি মূল মাঠেই সুন্দর করে মেলা আয়োজন সম্ভব। মেলার জায়গা এত বিশাল হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। এতে প্রতিবছর কিছু প্রকাশনা লাভবান হয় আর কিছু প্রকাশনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তিনি অভিযোগ করেন, বিচ্ছিন্নভাবে লিটলম্যাগের স্টল বরাদ্দ করাটাও দুঃখজনক। শিশু কর্নারটি বেশ অবহেলিত। এটি থাকতে পারত মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ করেই বা টিএসসির প্রবেশের মুখে। সেটা না করে অনেকটা তাদের ‘জঙ্গলে’ ফেলা হয়েছে। মেলা বইমেলা না থেকে হয়ে গেছে ‘বিকাশ’র মেলা। সব জায়গায় ‘বিকাশ’। খাবারের স্টলগুলোও প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি এখন যেন খাবারেরও মেলা মনে হয়। মেলায় পাইরেটেড বই বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু টাস্কফোর্সের তেমন কোনো ভূমিকা চোখে পড়ছে না।

পুথিনিলয়ের প্রকাশক শ্যামল পাল বলেন, খুব অল্প সময়ে এবং প্রায় প্রস্তুতি ছাড়া মেলা হচ্ছে। মেলার মাঠে এবার অন্যবারের মতো ইট বিছানো বা নান্দনিক বিষয়গুলো নেই। এটা সবার চোখে পড়ছে। স্টল বিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছে তাতে অনেক প্রকাশক সমস্যায় পড়েছেন।

আসলে এত বিশাল পরিসর না করলেও হতো। ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট ও টিএসসি অংশ প্রবেশের সময় কোথাও ভালোভাবে আলোকসজ্জা নেই। সিটি করপোরেশন যতটুকু আলোর ব্যবস্থা করেছে ঠিক ততটুকুই। মেলার তোরণেও আলোকসজ্জা নেই। আমি বলব, দায়সারা মেলা হচ্ছে। মেলাটি পুরোপুরি সব প্রকাশকবান্ধব হয়নি। আমি মনে করি আগামীতে মেলার ডিজাইন করার সময় প্রকাশ সমিতির নেতা-কর্মকর্তাদের পাশে রেখে ডিজাইন করা উচিত।

পূর্বদিকেই প্যাভিলিয়ন পড়েছে কাকলী প্রকাশনীর। প্রকাশনাটির প্রকাশক একে নাছির আহমেদ সেলিম কিছুটা ভিন্নমত প্রকাশ করে বলেন, ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের দিকে প্রবেশপথ এবং মেলাকে এভাবে বাড়ানোর বিষয়ে অনেক প্রকাশকরই মত ছিল। কারণ, সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরেফিরে বই কিনবেন-এটাই সুন্দর। এপাশে এখন হয়তো লোক সমাগম কম, কিন্তু সেটা গতবারের চেয়ে বেশি। আগামীতে আরও বেশি হবে বলেই মনে করি।

অমর একুশে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক ড. জালাল আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, মেলাকে আসলে সার্বিকভাবে চিন্তা করতে হবে। মেলায় যে উন্মুক্ত জায়গা রাখা হয়েছে সেটি আসলে রাখতে হবে। কারণ, যে কোনো স্থাপনা স্থায়ী বা অস্থায়ী যাই হোক নির্মাণ করার সময় সাধারণভাবে কিছু বৈজ্ঞানিক বিষয় বিবেচনায় আনতে হয়। বইমেলা সেদিক থেকে উন্মুক্ত রাখতে হয় শুধু সাধারণ দিনগুলোর কথা বিবেচনা করে নয়। সাপ্তাহিক দুই ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার, ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২১ ফেব্রুয়ারি, এবার ৭ মার্চ ও ১৭ মার্চ দিনগুলো মাথায় রেখে মেলার ডিজাইন করতে হয়েছে। প্রতিবছরই আমরা প্রকাশকদের কাছ থেকে নানা পরামর্শ নিয়ে মেলার উন্নতিসাধন করছি। আগামীতেও করব। ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের অংশে গেট আমরা ও প্রকাশকদের দশ বছরের সাধনার ফলাফল। আগামীতে সেদিকে জনসমাগম আরও বাড়বে বলেই আমরা আশা করি।

নতুন বই : মঙ্গলবার বইমেলায় নতুন বই এসেছে ৭৭টি। উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে পলাশ মাহবুবের বিদ্যাসাগরে বুদ্ধিও জয়, অন্যধারা থেকে সাইম জাকারিয়া সংকলিত ও গ্রন্থনায় বাংলাদেশের লোকশিল্পী তালিকা, অ্যাডর্ন থেকে ইব্রাহীম চৌধুরীর জর্জ ও মোবারকের আমেরিকান দিনকাল, আগামী থেকে হাসনাত আবদুল হাই রচিত তবুও শান্তি তবু আনন্দ : রবীন্দ্রনাথের নির্বাচিত গান ও ছবি। পারিজাত প্রকাশনী থেকে এসেছে মোনায়েম সরকারের গবেষণা- মুজিবনগর সরকারের সংকট ও সাফল্য, ঐতিহ্য থেকে এসেছে মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদের স্মৃতিচারণমূলক বই বাংলা একাডেমি আমার বাংলা একাডেমি, জয়তী থেকে এসেছে কায়কোবাদ মিলনের ইতিহাস বিষয়ক বউ-মুসলিম লীগের ইতিহাস, জিনিয়াস পাবলিকেশন্স থেকে এসেছে স্বদেশ রায়ের প্রবন্ধ গ্রন্থ সম্পাদকের টেবিল, হাওলাদার প্রকাশনী থেকে এসেছে লে. কর্নেল (অব.) এম. এ হামিদের আত্মজীবনী ফেলে আসা সৈনিক জীবন।

মঞ্চের আয়োজন : বিকাল বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় সংগীত ও কবিতায় একুশের চেতনা শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাইম রানা। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ফেরদৌস হোসেন ভূঁইয়া, এএফএম হায়াতুল্লাহ এবং মুস্তাফিজ শফি। সভাপতিত্ব করেন নিরঞ্জন অধিকারী। এদিন ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন নাসিমা আনিস এবং জাহানারা পারভীন। অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি শাহ কামাল সবুজ। আবৃত্তি পরিবেশন করেন রোকসানা পারভীন স্মৃতি এবং ঝর্ণা আলমগীর। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল ফয়েজুল বারীর পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন সুরতাল সংগীত একাডেমীএর পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন সুভাষ বিশ্বাস, নূরুল ইসলাম, মনছুর আহাম্মদ, বাউল জাহাঙ্গীর, অণিমা মুক্তি গোমেজ, রহিমা খাতুন, মীর তারিকুল ইসলাম, সানজিদা ইয়াসমিন লাভলী ও লাভলী শেখ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here