ঈদুল আজহা ও কুরবানিতে যা করতেন বিশ্বনবি

0
84

ঈদুল আাজহার দিনটি মুসলিম উম্মাহর জন্য খুশির দিন। আরাফার দিন মুমিন মুসলমানের জন্য মাগফেরাতের দিন। আল্লাহর দরবারে কুরবানি পেশ করার সৌভাগ্য এবং কবুল হওয়া কুরবানি থেকে মেহমানদারী অর্জন এই খুশির মূল কারণ। কুরবানির দিন খুশি ও আনন্দ উদযাপন করা সেই ইবাদতেরই পূর্ণাঙ্গতার স্বরূপ।

ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান ও বিশেষ ইবাদত ঈদুল আজহা ও কুরবানি। এটি মুসলিম উম্মাহর আত্মত্যাগ ও ঐক্যের প্রতীক। এ কুরবানি মুমিন বান্দাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে ধাবিত করে।

উম্মতে মুসলিমাহ এ কুরবানিকে মিল্লাতে ইবরাহিমের অনন্য আদর্শ মনে করেই আদায় করে থাকে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের এ আদর্শ পালন করেছেন এবং পালন করতে বলেছেন। হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা থেকেই তা প্রমাণিত।

ইসলামি শরিয়তে যে কোনো ইবাদতের ক্ষেত্রে ইখলাসের পাশাপাশি প্রধান লক্ষ্যণীয় বিষয় হল প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ। তাই ঈদুল আজহা ও কুরবানি আদায়ে বিশ্বনবির করণীয় আমাদের জন্য পালনীয়। মর্যাদার দিন ঈদুল আজহা ও কুরবানি কীভাবে আদায় করতেন তিনি?

ঈদুল আজহা ও কুরবানিতে বিশ্বনবির আদর্শ
১. ঈদুল আজহার দিনের সর্বপ্রথম আমল হলো ঈদের নামাজ আদায় করা। হাদিসে এসেছে-
হজরত বারা ইবনে আযেব রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানির দিন আমাদের উদ্দেশ্যে খুতবা দিলেন। তাতে বললেন, আমাদের এই দিনের প্রথম কাজ ঈদের নামাজ আদায় করা। সুতরাং যে এভাবে করবে তার কাজ আমাদের তরিকা মতো হবে। আর যে আগেই জবেহ করেছে (তার কাজ তরিকা মতো হয়নি) অতএব তা পরিবারের জন্য প্রস্তুতকৃত গোশত, (আল্লাহর জন্য উৎসর্গিত) কুরবানি নয়।’ (বুখারি)

২. নামাজের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানির পশু জবেহ করতেন। নিজের পশু নিজ হাতেও জবাই করতেন। হাদিসে এসেছে-
হজরত জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু এক দীর্ঘ হাদিসে বর্ণনা করেন, ‘অতঃপর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানির স্থানে এলেন এবং নিজ হাতে তেষট্টিটি উট নহর করলেন।’ (মুসলিম)

৩. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে কুরবানি করতেন এবং কুরবানি করার সময় যা পড়তেন; তাও এসেছে হাদিসে-
হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুটি সাদা-কালো বর্ণের (বড় শিং বিশিষ্ট) নর দুম্বা কুরবানি করেছেন। আমি দেখেছি, তিনি দুম্বা দুইটির গর্দানে পা রেখে ‘বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার’ বললেন। অতঃপর নিজ হাতে জবেহ করলেন।’ (বুখারি)

হজরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানির দিন দুইটি সাদা-কালো, বড় শিং বিশিষ্ট, খাসি দুম্বা জবেহ করেছেন। তিনি যখন তাদের শায়িত করলেন তখন বললেন-
إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ عَلَى مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ إِنَّ صَلاَتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَاىَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ اللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ عَنْ مُحَمَّدٍ وَأُمَّتِهِ بِاسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَ
এরপর জবেহ করলেন।’ (আবু দাউদ)

৪. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ কুরবানির পাশাপাশি উম্মাহাতুল মুমিনীন; এমনকি নিজ উম্মতের পক্ষ থেকেও কুরবানি করেছেন। হাদিসে এসেছে-
হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানির জন্য একটি শিং বিশিষ্ট দুম্বা আনতে বললেন। যার পা কালো, পেটের চামড়া কালো এবং চোখ কালো। দুম্বা আনা হলে নবীজী বললেন, আয়েশা, আমাকে ছুরি দাও। এরপর বললেন, একটি পাথরে ঘষে ধারালো করে দাও। তিনি ধারালো করে দিলেন। এরপর তিনি ছুরি হাতে নিলেন এবং দুম্বাটিকে মাটিতে শোয়ালেন। এরপর বিসমিল্লাহ বলে জবাই করলেন এবং বললেন-
اللهم تقبل من محمد، وآل محمد، ومن أمة محمد
ইয়া আল্লাহ! মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে, মুহাম্মাদের পরিবারের পক্ষ থেকে এবং মুহাম্মাদের উম্মতের পক্ষ থেকে (এ কুরবানি) কবুল করুন।’ (মুসলিম)

অন্য বর্ণনায় হজরত আয়শা রাদিয়াল্লাহু আনহু আরো বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ হতে গরু দ্বারা কুরবানি করেছেন।’ (বুখারি)

৫. পরিবারবর্গসহ নিজে কুরবানির পশুর গোশত খেতেন এবং অন্যদেরকেও খাওয়ানো ও গোশত সাদকা করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। হাদিসে এসেছে-
হজরত আবু রাফে রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কুরবানি করতেন। তখন তার গোশত গরিবদেরকে খাওয়াতেন, পরিবারবর্গসহ নিজেও সেখান থেকে খেতেন।’ (বায়হাকি)

হজরত আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, (কুরবানির গোশত) তোমরা নিজেরাও খাও, অন্যদেরকেও খাওয়াও…।’ (মুসলিম)

৬. অনেক সময় তিনি সাহাবাদের মাঝে সরাসরি কুরবানির পশুও বন্টন করতেন। হাদিসে এসেছে-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার নিজ সাহাবীদের মাঝে কুরবানির পশু বন্টন করলে হজরত উক্ববা রাদিয়াল্লাহু আনহু ও সেখান থেকে একটি পেলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, তুমি এটা দিয়েই কুরবানি কর।’ (বুখারি)

সুতরাং মুসলিম উম্মাহর উচিত, হাদিসের অনুসরণ ও অনুকরণে ঈদুল আজহা ও কুরবানি উদযাপন করা। বিশ্বনবির আদর্শ নিজেদের মধ্যে বাস্তবায়ন করা।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে হাদিসের অনুসরণ ও অনুকরণে বিশ্বনবির মতো ঈদুল আজহার নামাজ পড়ার এবং কুরবানির পশু জবাই ও অন্যান্য কাজগুলো যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here