মাধ্যমিকের বই ছাপা বাকি ৪৬ শতাংশ

0
114

আর মাত্র ২০ দিন পর শুরু হবে নতুন শিক্ষাবর্ষ। কিন্তু এখনও মাধ্যমিক স্তরের ৪৬ শতাংশ পাঠ্যবই মুদ্রণ বাকি আছে। প্রাথমিক স্তরের পরিস্থিতি ভালো। তবে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরের ইংরেজি ভার্সনের ছাপা কাজের অবস্থা করুণ।

প্রাক-প্রাথমিক স্তরের বই মুদ্রণের কার্যাদেশই এখনও হয়নি। আর আগামী বছর নতুন শিক্ষাক্রমের পরীক্ষামূলক প্রয়োগের জন্য প্রথম ও ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য নতুন পাঠ্যবই মুদ্রণের কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত শুধু ষষ্ঠ শ্রেণির বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের কোনো খবর নেই।

এ অবস্থায় বছরের প্রথম দিন দেশের সব স্কুলে সব শিক্ষার্থী সব বই পাবে না বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

অবশ্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা যুগান্তরকে বলেন, প্রাথমিক স্তরের বই ছাপানোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে আছে। মাধ্যমিক কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যে যে কোনো মূল্যে কাজ শেষ করা হবে। প্রাক-প্রাথমিকের বই ছাপানোর চুক্তি আগামী সপ্তাহের মধ্যে শেষ করা হবে। এরপর মুদ্রাকররা সময় পেলেও তাদের এ মাসের মধ্যেই বই সরবরাহ করতে বলা হবে। বই নিয়ে প্রতি বছরই সংকটের কথা বলা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা বই পেয়ে যায়। প্রাথমিকের বই পুরোদমে মুদ্রিত ও সরবরাহ হচ্ছে। মাধ্যমিকের বেশিরভাগ বইয়ের চুক্তি শেষ হয়েছে। কিছু বই সরবরাহও হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক স্তর নিয়ে যে সমস্যা, তা দু-এক দিনের মধ্যে কেটে যাবে।

প্রাক- প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য এবার প্রায় ৩৫ কোটি বই ছাপানো হচ্ছে। এরমধ্যে প্রাথমিকে ১০ কোটি আর মাধ্যমিকে ২৫ কোটি। সাধারণত ১ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া হয়। সেই হিসাবে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে বাকি আছে ২০ দিন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মাধ্যমিক স্তরের বই যথাসময়ে কিছুতেই পৌঁছানো সম্ভব হবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কেননা, বুধবার পর্যন্ত ১৩ কোটি বই ছাপানো হয়েছে। আর এরমধ্যে মাত্র সাড়ে ৮ কোটি মাঠপর্যায়ে পৌঁছানোর লক্ষ্যে পাঠানো হয়েছে। সেই হিসাবে এখনও ১২ কোটি বা ৪৬ শতাংশ বই মুদ্রণই হয়নি।

অন্যদিকে প্রাথমিক স্তরের ১০ কোটির মধ্যে ৮৩ শতাংশ ছাপানো শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে। এ স্তরের ৫ লট (প্রায় ২০ লাখ) বই মুদ্রণের কাজ পেয়েছিল বর্ণশোভা নামের একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তারা শেষ মুহূর্তে চুক্তি করেনি। এরফলে এই বইয়ের কাজ পিছিয়ে গেছে। পরে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ওই কাজ দেওয়া হয়েছে। এগুলো কাজে খুব পিছিয়ে। আর বর্ণশোভার জামানতের ২৮ লাখ টাকা বাজেয়াপ্ত করেছে এনসিটিবি।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের উল্লিখিত সংখ্যার মধ্যেই ইবতেদায়ি, দাখিল এবং ইংরেজি ভার্সনের বই হিসাব করা হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, ইংরেজি ভার্সনের বই মুদ্রণের গতি এবারে কম।

বিশেষ করে মাধ্যমিকের পরিস্থিতি বেশি খারাপ। এর পাশাপাশি মাধ্যমিকের অন্য বইয়ের মুদ্রণ পরিস্থিতিও করুণ। এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের দরপত্র প্রক্রিয়া এবার দেরিতে করা হয়। মুদ্রাকররা ৯ নভেম্বর পর্যন্ত কাজটি করার চুক্তির সময় পেয়েছিলেন। দরপত্র অনুযায়ী, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বই ছাপাতে চুক্তির পর ৭০ দিন আর অষ্টম-নবম শ্রেণির বইয়ের জন্য ৮৪ দিন আছে। এ হিসাবে প্রথম দুই শ্রেণির বই সরবরাহে মুদ্রাকররা মধ্য জানুয়ারি পর্যন্ত সময় পাচ্ছেন। আর পরের দুই শ্রেণির বই ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত পৌঁছায়।

এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির এক সদস্য যুগান্তরকে বলেন, আইনত মুদ্রাকররা যে সময়ই পাক না কেন, তারা জানে যে-এটা সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পভুক্ত। এটির অনিবার্য সময়সীমা আছে। বর্তমানে মেশিন এতটাই অত্যাধুনিক যে মুদ্রাকররা চাইলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব। এর প্রমাণ হচ্ছে, ৭ ডিসেম্বর একদিনে ৭৬ লাখ বই পাঠানো হয়েছে। তাছাড়া সক্ষমতা দেখেই কাজ দেওয়া হয়েছে। তাই যে বা যারা সরকারকে সর্বোচ্চটা দেবে না, তাদের চিহ্নিত করে রাখা হবে। আগামীতে তাদের কাজ দেওয়া হবে।

ভুলের দায় মুদ্রাকর ও শিক্ষার্থীদের : এবার জীবনে প্রথম স্কুলে যাবে প্রায় ৩৪ লাখ শিক্ষার্থী। তাদের জন্য অনুশীলন গ্রন্থ বা হাতের লেখার খাতা ‘এসো লিখতে শিখি’ এবং পাঠ্য ‘আমার বই’ ছাপানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। অনুশীলন গ্রন্থ ইতোমধ্যে মুদ্রাকররা সরবরাহ করেছেন। কিন্তু আটকে গিয়েছিল পাঠের বইটি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) সূত্র জানায়, ‘আমার বই’ মুদ্রণের জন্য এবার আটটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য (প্যারামিটার) নির্ধারণ করে দেয় এনসিটিবি। এগুলোর মধ্যে ‘গ্লোস’ (চকমক বা ঝিলিক দেওয়ার ক্ষমতা) ৪০ জিইউ নির্ধারণ করা হয়। গত দশ বছর ধরে এ শর্ত ছিল না। কেননা, এ স্তরের বইটি ছাপানো হয় ‘হোয়াইট গ্লোসি প্রিন্টিং পেপারে’। এর পুরুত্ব ৮০ শতাংশ, উজ্জ্বলতা ৮৫ শতাংশ, উড-ফ্রি পাল্পসহ ৭টি শর্ত আরোপ করা হয়। সাধারণত আর্ট পেপার বা আর্ট কার্ডে গ্লোস শর্ত থাকে। অর্থাৎ অবাস্তব শর্ত জুড়ে দেওয়ায় মুদ্রাকররা বাজারে কাগজ পাচ্ছেন না। এ কারণে তারা ভুল সংশোধন করে শর্ত শিথিল করতে এনসিটিবিকে অনুরোধ জানান। কিন্তু সে পথে না গিয়ে সংস্থাটি আগেরটি বাতিল করে নতুন দরপত্র ডাকে। সেটি অনুযায়ী ৮ ডিসেম্বর ৪টি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। প্রক্রিয়া অনুযায়ী এখন এনসিটিবি এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করবে। এরআগে এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন নিতে হবে। এতে অন্তত এক সপ্তাহ চলে যেতে পারে। এরপর মুদ্রাকরদের কার্যাদেশ দেওয়া হবে। এটি গ্রহণের পর ব্যাংক গ্যারান্টি দাখিলে তারা ৭ দিন পাবেন। এই স্তর শেষ হলে চুক্তি চূড়ান্ত করবে। কার্যাদেশপ্রাপ্তরা ২৮ দিন সময় পাবেন। তারপরে তারা বই মুদ্রণ শুরু করবেন এবং তা সরবরাহে তারা ২৫ দিন সময় পাবেন। এ হিসাবে ফেব্রুয়ারি লেগে যেতে পারে বই সরবরাহে।

মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এনসিটিবি বই ছাপতে যে কাগজ নির্ধারণ করেছিল দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎসে খোঁজ নিয়েও তারা সেই কাগজ পাননি। এ অবস্থায় সমস্যার সমাধানে বারবার ধরনা দেওয়া সত্ত্বেও এনসিটিবির দায়িত্বপ্রাপ্তরা সমস্যা নিষ্পত্তি করেননি। মূলত তারা দরপত্র তফসিল তৈরিতে ভুল করেছেন। শাস্তি থেকে বাঁচতে সংশোধনে না গিয়ে নতুন দরপত্র ডাকে। তাদের এ মানসিকতা ও ভুলের দায় চেপেছে মুদ্রাকর ও শিক্ষার্থীদের ওপর। কেননা, আগের দরপত্র অনুযায়ী মুদ্রাকররা বইয়ের কাগজ কিনেছিলেন। তখন এর দর ছিল ৯৫ হাজার টাকা টন। বর্তমানে ৮২ হাজার টাকা দর। কাজও পেয়েছেন বাজার দর অনুযায়ী। ফলে মুদ্রাকরদের সবমিলে বড় ধরনের গচ্চা যাচ্ছে। এছাড়া নতুন দরপত্রের কারণে এখন বই ছাপতে দেরি হবে। ফলে শিক্ষার্থীরা সময়মতো তা পাবে না।

নতুন শিক্ষাক্রমের বই : সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবারে নতুন শিক্ষাক্রমে প্রথম ও ষষ্ঠ শ্রেণির বই তৈরির কথা। এগুলো দেশের ১০০ উপজেলার ১০০ স্কুলে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বা পাইলটিং হবে। এরমধ্যে ৪ থেকে ৭ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জে একটি বিলাসবহুল রিসোর্টে বিশেষজ্ঞদের রেখে ষষ্ঠ শ্রেণির বই তৈরি করা হয়। এখন তা সম্পাদনা করা হবে। এরপর মুদ্রণের প্রক্রিয়া শুরু হবে। জানা গেছে, পাইলটিং বাস্তবায়নের জন্য প্রধান শিক্ষক ও একাডেমিক সুপারভাইজারদের আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ শুরু হচ্ছে। মাধ্যমিক স্তর এভাবে এগিয়ে গেলেও প্রাথমিক স্তরের কোনো খবর নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো তথ্য জানাতে পারেননি এনসিটিবি চেয়ারম্যান। তবে বলেছেন, সিদ্ধান্ত অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here