নেতাদের ‘একক আধিপত্য’ প্রথা ভাঙছে বিএনপি

0
105

সাংগঠনিক জেলা শাখার কমিটি গঠনে বিএনপি স্থানীয় নেতাদের ‘একক আধিপত্য’ প্রথা ভেঙে দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দলের শীর্ষ পদ আঁকড়ে থাকা বেশ কয়েকজন নেতার কারণে সংশ্লিষ্ট জেলায় নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি না হওয়ায় বিএনপি এমন পদক্ষেপ নিয়েছে।

এছাড়া কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা জেলার শীর্ষ পদে নিজেদের অনুসারী রেখে স্থানীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগও পেয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। এমন অবস্থায় ‘অতি গ্রুপিং’ সৃষ্টিকারী নেতাদের বাদ দিয়ে তৃণমূলের পরিচ্ছন্ন ও পরীক্ষিতদের দিয়ে জেলার নতুন কমিটি দেওয়া হচ্ছে। বিএনপি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সম্প্রতি ঘোষিত নতুন কমিটিতে স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী তিন নেতাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বরিশাল মহানগরের মজিবর রহমান সরোয়ার, খুলনা মহানগরের নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও রাজশাহী মহানগরের মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে কমিটিতে রাখা হয়নি।

নরসিংদী ও ফরিদপুরের নতুন নেতৃত্ব গঠনেও একই পথে হাঁটছে দলটি। সেখানেও কেন্দ্রীয় দুই নেতার অনুসারীদের না রাখার বিষয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের আপত্তি দলীয় হাইকমান্ডকে জানানো হয়েছে।

দলটির একাধিক নীতিনির্ধারক জানান, জেলা শাখায় কেউ ২০ বছর, আবার কেউ ৩০ বছর ধরে নেতৃত্বে রয়েছেন। এটা তো হতে পারে না। আবার একাধিক নেতা কেন্দ্রীয় কমিটিতে থাকার পরও জেলার নেতৃত্বে আছেন। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ‘এক নেতা এক পদ’ কার্যকরে তাদের একাধিকবার জেলার পদ ছাড়ার অনুরোধ করা হলেও তা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

তারা আরও বলেন, স্থানীয় রাজনীতিতে গ্রুপিং থাকবে। এর মানে এই নয় যে, একজন নেতার একক আধিপত্যের কারণে ওই জেলায় কোনো নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে না। এখন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে যারা এলাকায় থাকেন, ত্যাগী ও পরীক্ষিত এমন স্থানীয় নেতাদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে দলটির কেন্দ্রীয় একাধিক নেতার ধারণা-কয়েকজন নেতার একক আধিপত্য ভাঙতে গিয়ে কয়েকটি গ্রুপের অনুসারীরা বিএনপির রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তারা জানান, বরিশালের রাজনীতিতে সরোয়ার একটি ‘ফ্যাক্টর’। তাকে সম্মানজনকভাবে স্থানীয় রাজনীতি থেকে বাদ দেওয়ার সুযোগ ছিল। একইভাবে খুলনার মঞ্জুর ক্ষেত্রেও। তারা দুজনই দলের পরীক্ষিত নেতা। অথচ তাদের অনুসারীদেরও নতুন কমিটিতে রাখা হয়নি। এতে করে দীর্ঘ বছর ধরে যারা তাদের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন তাদের মনোবল ভেঙে গেছে এবং এটাই স্বাভাবিক। সব গ্রুপের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া না হলে ভবিষ্যতে আন্দোলন-কর্মসূচি সফল হওয়া নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, দল পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। যেসব জেলার কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ সেখানে কাজ চলছে। নতুন কমিটি করা হচ্ছে। কমিটি পুনর্গঠনে যোগ্য ও ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে ও হবে। বিগত সময়ে হামলা-মামলা মোকাবিলা করে যারা রাজপথে ছিলেন তারাই অগ্রাধিকার পাবেন। কারণ, সামনে আমাদের কঠিন সময়। খালেদা জিয়ার মুক্তি, নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিতে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আন্দোলন করতে হবে। তাই আন্দোলনমুখী নেতৃত্বকেই আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সবার মতামত নিয়ে এসব কমিটি করবেন।

বৃহস্পতিবার খুলনা জেলা ও মহানগর, রাজশাহী মহানগর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে বাদ দিয়ে খুলনা মহানগর শাখার আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটি গঠনের মাধ্যমে খুলনা বিএনপিতে মঞ্জুর ৩৩ বছরের একক আধিপত্যের অবসান ঘটেছে।

সাবেক ছাত্রদল নেতা মঞ্জু ১৯৮৮ সালে খুলনা মহানগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক হন। এরপর ১৯৯৩ সালে মহানগরের সাধারণ সম্পাদক, ২০০৯ সালে আহ্বায়ক এবং একই বছরে সভাপতি হন। মঞ্জুর সঙ্গে বাদ পড়েছেন সাবেক মেয়র মনিরুজ্জামান মনিও।

রাজশাহী মহানগর কমিটি থেকে বাদ পড়েন আরেক প্রভাবশালী নেতা সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। সেখানে প্রবীণ নেতা কবির হোসেন ও মিজানুর রহমান মিনু অনুসারীদের স্থান দেওয়া হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কমিটিতে স্থান পাননি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সংসদ সদস্য হারুন অর রশিদের অনুসারীরা।

এর আগে নভেম্বরে মজিবর রহমান সরোয়ারকে বাদ দিয়ে বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। এ কমিটির মাধ্যমে বরিশাল বিএনপিতে সাবেক এমপি, মেয়র ও হুইপ সরোয়ারের প্রায় ৩০ বছরের একক আধিপত্যের অবসান হয়।

বিএনপির প্রভাবশালী এক নেতা জানান, কমিটিতে এমন নেতাদের স্থান দেওয়া হয়েছে, যারা অপেক্ষাকৃত কম গ্রুপিং করেন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান চান দ্রুত সময়ের মধ্যে তৃণমূলের পুনর্গঠনের কাজ শেষ করতে। এক্ষেত্রে যারা বাধা, তাদেরই বাদ দেওয়া হয়েছে। কে কোনো বলয়ের নেতা, তা দেখা হয়নি।

কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে ‘এক নেতার এক পদ’ গঠনতন্ত্রে সংযুক্ত করে বিএনপি। পরে বিএনপির বরিশাল মহানগরের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার, নরসিংদী জেলার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, খুলনা মহানগর সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ) নজরুল ইসলাম মঞ্জু, রাজশাহী মহানগরের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলসহ দুই পদে থাকা নেতাদের একটি পদ ছেড়ে দিতে বলা হয়। কিন্তু উভয় পদ ধরে রাখায় দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ক্ষুব্ধ হন। এ কারণে এখন সংশ্লিষ্ট জেলার বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠনে তাদের মতামত খুব একটা প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে না।

সূত্র জানায়, নরসিংদী ও ফরিদপুর জেলারও আহ্বায়ক কমিটি শিগগিরই দেওয়া হবে। দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতার গ্রুপিংয়ের কারণে এ দুই জেলার কমিটি গঠন করা যায়নি। পরে দলের হাইকমান্ড ফরিদপুর জেলার কমিটি গঠনে স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে ও নরসিংদী জেলার কমিটি গঠনে স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে দায়িত্ব দেয়। তারা ইতোমধ্যে কয়েক দফা বৈঠকও করেছেন। জানা গেছে, এ দুই জেলায়ও একক আধিপত্য প্রথা ভেঙে দেওয়া হবে।

ফরিদপুরের স্থানীয় নেতারা জানান, এ জেলায় মূলত বিএনপির দুটি গ্রুপ রয়েছে। একটির নেতৃত্বে আছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শ্যামা ওবায়েদ। আরেকটির নেতৃত্ব আছেন প্রয়াত নেতা চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের মেয়ে নায়াব ইউসুফ।

নায়াব ইউসুফের সঙ্গে কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুলও রয়েছেন। এ কারণে এ বলয়ের নেতাকর্মীরা স্থানীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী। দুগ্রুপের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে কমিটি নেই ফরিদপুরে। তবে স্থানীয় অধিকাংশ নেতা চাইছেন-দুগ্রুপের বাইরে কাউকে জেলার নেতৃত্বে আনা হোক। এটি করা হলে দলের জন্য সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here