কুয়েটে ছাত্রলীগই শেষ কথা

0
121

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) হলের সিট বরাদ্দ, ডাইনিং ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই রয়েছে ছাত্রলীগের খবরদারি। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি ছাত্র হল চলে ছাত্রলীগ নেতাদের কথামতো। মেধার ভিত্তিতে সিট বরাদ্দের কথা থাকলেও নেতাদের ‘দয়া’ ছাড়া কোনো শিক্ষার্থী সিট পায় না।

জোর করে ডাইনিং ম্যানেজারের পদও বাগিয়ে নেন নেতারা। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ নিয়েও বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে। এছাড়া রয়েছে ক্যাম্পাসে মাদক বাণিজ্য ও ভিন্নমতের ‘ট্যাগ’ দিয়ে ছাত্রদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ। কুয়েটের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি কুয়েট শিক্ষক ড. মো. সেলিম হোসেনের রহস্যজনক মৃত্যুর পর ছাত্রলীগের নানা অপকর্ম আলোচনায় আসে। অভিযোগ উঠেছে, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মানসিক নির্যাতনে তার মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় শনিবার ছাত্রলীগের নয় নেতাকে কুয়েট থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের ৩১ জুলাই এক বছর মেয়াদি কমিটি হয় কুয়েট ছাত্রলীগের। কমিটির সভাপতি হন আবুল হাসান শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজান। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান পান ২২১ জন।

সেই ‘এক বছরের’ কমিটি এখনও বহাল। এর মধ্যে সভাপতি শোভন চলতি বছরের ২৪ মে পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে এলজিইডিতে চাকরি নেন। ফলে এক প্রকার সেজানের একক নিয়ন্ত্রণে ছিল কুয়েট।

কুয়েটের সাতটি হল। এর মধ্যে একটি ছাত্রী হল। বাকি ছয়টি ছাত্রদের। এগুলো হলো- খানজাহান আলী হল, ড. এম রশিদ হল, লালন শাহ হল, অমর একুশে হল, ফজলুল হক হল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল। এসব ছাত্র হল ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ন্ত্রণে।

এরমধ্যে অমর একুশে হল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল বড় হওয়ায় এ দুই হলে প্রতি মাসে চারজন করে ডাইনিং ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন।

অন্য চারটি হলে ম্যানেজার থাকে এক-দুজন করে। হল কমিটির সভায় ম্যানেজারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। জোর করে এ পদ বাগিয়ে নেয় ছাত্রলীগ। মূলত আয় ও প্রভাব খাটাতেই ডাইনিং ম্যানেজার পদে নিজের অনুগতদের রাখতে চান ছাত্রলীগ নেতারা।

জানা গেছে, হল ম্যানেজারের কাজ মূলত বাজার করা। এ ছাড়া প্রতি মাসেই প্রত্যেক ছাত্রের বিপরীতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত বিল করা হয়। বাজার ও অতিরিক্ত বিলের কারণে ছোট হলগুলোতে প্রতি মাসে একজন ম্যানেজারের ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা আয় হয়। বড় হলগুলোতে আয় লাখ টাকার উপরে। এ আয়ের একটি অংশ যায় নেতাদের পকেটে।

নভেম্বরে লালন শাহ হলে ডাইনিং ম্যানেজার ছিলেন নাজমুস সাকিব। ছাত্রলীগের সভাপতি গ্রুপের অনুসারী এ নেতাকে বাদ দিয়ে ডিসেম্বরে নিজের এক অনুসারীকে নিতেই প্রভোস্ট ড. মো. সেলিম হোসেনকে চাপ প্রয়োগ করেছিলেন কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজান।

অভিযোগ উঠেছে, ছাত্রলীগ নেতাদের এমন চাপ সহ্য করতে না পেরে ১ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রভোস্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেন ড. কল্যাণ কুমার হালদার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ড. কল্যাণ কুমার হালদার বলেন, ড. সেলিম আমার খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তার মৃত্যুর পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আমি পদত্যাগ করেছি।

কুয়েটের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, জোর করে ছাত্রলীগের মিছিলে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। কেউ যেতে না চাইলে নির্যাতন করা হয়; ল্যাপটপ, মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এছাড়া ভিন্নমত প্রকাশ করলেই শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

২০১৯ সালের ২৪ মার্চ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শাহীনুজ্জামানসহ তিন শিক্ষার্থীকে ফজলুল হক হলের একটি কক্ষে আটকে মারধর করা হয়। এরমধ্যে শাহীনুজ্জামানের কিডনিতে মারাত্মক আঘাত লাগে।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভিন্ন মতের ‘ট্যাগ’ দিয়ে দুই শিক্ষার্থীকে মারধর করে পুলিশে তুলে দেওয়া হয়। এর মধ্যে আলামিনের চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুয়েটের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগেও ছাত্রলীগের হস্তক্ষেপের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ উঠেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে ছাত্রলীগ নেতারা নিয়োগ বাণিজ্য করেন। কিছুদিন আগে নিয়োগ দুর্নীতির ঘটনায় চতুর্থ শ্রেণির এক কর্মচারী চাকরিচ্যুত হয়েছে। এছাড়া ক্যাম্পাসে মাদক বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজান যুগান্তরকে বলেন, ক্যাম্পাসে মাদক বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য এবং হলে শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনায় ছাত্রলীগ জড়িত নয়। এগুলো ভিত্তিহীন অভিযোগ।

হলে ডাইনিং ম্যানেজার পদের জন্যও আমরা হল কর্তৃপক্ষকে কখনও চাপ দেই না। তবে মাঝেমধ্যে অনুরোধ করেছি। এটা আমরা করতেই পারি।

শিক্ষকদের শোকসভা ও দোয়া : ড. সেলিমের মৃত্যুতে কুয়েটের শিক্ষক ক্লাব ভবনে রোববার সকালে এক শোক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ড. সেলিমের স্ত্রী সাবিনা খাতুন রিক্তা অনলাইনে যুক্ত হন। তিনি তার স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচারের দাবি জানান।

পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান। এছাড়া বাদ আসর কুয়েটের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ড. সেলিমের রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে।

কুয়েট শিক্ষকের লাশ তুলতে আবেদন পুলিশের : ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) শিক্ষক ড. মো. সেলিম হোসেনের লাশ কবর থেকে তোলার আবেদন করা হয়েছে।

রোববার আদালতে এ আবেদন করে পুলিশ। এদিকে শিক্ষকের মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির বাকি দুই সদস্যের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। কমিটি রোববার বিকাল থেকে কাজ শুরু করেছে।

খানজাহান আলী থানার ওসি প্রবীর কুমার বিশ্বাস জানান, শিক্ষক ড. সেলিমের লাশের ময়নাতদন্ত করা প্রয়োজন। এজন্য দুপুরে তারা খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে আবেদন জানিয়েছেন। তবে যেহেতু এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি, সে কারণে আদালত লাশ উত্তোলনের অনুমতি দেয়নি।

আদালত থেকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরপর তারা খুলনা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন জানান। লাশ যেহেতু কুষ্টিয়াতে দাফন করা হয়েছে, সে কারণে খুলনার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবেদনটি কুষ্টিয়ার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

ময়নাতদন্ত ছাড়াই ১ ডিসেম্বর ড. সেলিমের লাশ কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বাঁশগ্রামে দাফন করা হয়েছিল।

এদিকে রোববার দুপুরে তদন্ত কমিটির বাকি দুই প্রতিনিধির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। খুলনা জেলা প্রশাসন ও মেট্রোপলিটন পুলিশ তাদের প্রতিনিধি দিয়েছে। এর মধ্যে জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন সহকারী কমিশনার দেবাশীষ বসাক এবং কেএমপির প্রতিনিধি হয়েছেন কেএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (উত্তর) মো. শাহাবুদ্দীন।

কমিটিতে থাকা তিন শিক্ষকের নাম আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল। এরা হলেন- কমিটির প্রধান কুয়েটের প্রফেসর ড. মহিউদ্দিন আহমাদ এবং দুই সদস্য প্রফেসর ড. খন্দকার মাহবুব হাসান ও সদস্য সচিব প্রফেসর ড. মো. আলহাজ উদ্দীন। রোববার বিকাল থেকে কাজ শুরু করেছে তদন্ত কমিটি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here