জড়িত ৪৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান

0
106

দেশ থেকে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে ৪৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বিশ্বব্যাপী আলোচিত পানামা পেপারস ও প্যারাডাইস পেপারসের প্রতিবেদন থেকে যুগান্তরসহ তিনটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দুদক প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। আজ এ প্রতিবেদন হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হবে।

জানতে চাইলে শনিবার সন্ধ্যায় দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান যুগান্তরকে বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট একটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন অর্থ পাচারের বিষয়ে। সে অনুসারে রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয়েছে। পানামা পেপারস, প্যারাডাইস পেপারস, আইসিআইজেড থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এটি তৈরি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আজ বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হকের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে এ তালিকা দাখিল করা হবে।

তালিকা প্রসঙ্গে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক যুগান্তরকে বলেন, অর্থ পাচারকারীদের তালিকা দেওয়ার জন্য দুদকের প্রতি হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। আজ এজন্য দিন ধার্য করা আছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইসিআইজে (ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম) ২০১৬ সালে পানামা পেপারস এবং ২০১৮ সালে প্যারাডাইস পেপারস তৈরি করে। প্রতিবেদনে বিদেশে অর্থ পাচারের তালিকায় প্রায় ৮ লাখ কোম্পানি এবং ৭ লাখ ২০ হাজারের বেশি ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। এত অর্থ পাচারকারী হিসাবে বাংলাদেশের ৮২ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের নাম তুলে ধরা হয়। তবে দুদকের দেওয়া প্রতিবেদনে ৪৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানযোগ্য। সুইস ব্যাংকসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করা অর্থ উদ্ধারের তথ্য আদান-প্রদানসহ একটি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশ অনুসৃত কৌশল পর্যালোচনা করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে একটি কর্মকৌশল প্রণয়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটকে (বিএফআইইউ) অনুরোধ করা হয়েছে। বিএফআইইউ সে আলোকে ব্যবস্থা নিয়েছে। এতে আরও বলা হয়, আবদুল আউয়াল মিন্টুর বিরুদ্ধে জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একটি অভিযোগ বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত অনুবিভাগে অনুসন্ধান চলছে। মুসা বিন শমসেরের বিরুদ্ধে জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে করা মামলা বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত অনুবিভাগে তদন্ত চলছে।

পানামা পেপারস : কর ফাঁকি দিয়ে নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়া, আইন অমান্য করে দেশের টাকা বিদেশে পাচার ও অবৈধ আয়ের টাকায় বৈধ ক্ষমতার মালিক হওয়া প্রসঙ্গে ২০১৬ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পানামা পেপারস শিরোনামে বিশ্বজুড়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

বিশ্বের সাবেক ও বর্তমান শতাধিক রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, খেলোয়াড়, অভিনেতা, শিল্পী অনেকেই এরূপ অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করেছেন বলে সংবাদে জানা যায়।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে ও আইসিআইজের ওয়েবসাইটে বর্ণিত দেশভিত্তিক তালিকা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশির ক্ষেত্রে প্রথম পর্বে ৪৩ ব্যক্তি ও ২টি প্রতিষ্ঠান এবং দ্বিতীয় পর্বে ১৮ ব্যক্তি ও ৫টি প্রতিষ্ঠানসহ ৬১ ব্যক্তি এবং ৭টি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়।

এর মধ্যে দুদক ১৪ জনের একটি তালিকা আদালতে আজ উপস্থাপন করবে। এর মধ্যে রয়েছেন-বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান ফয়সাল আহমেদ চৌধুরী, সেতু করপোরেশনের পরিচালক উম্মে রুবানা, একই প্রতিষ্ঠানের এমডি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, সিডব্লিউএনর আজমত মঈন, বনানী এলাকার সালমা হক, একই এলাকার এসএম জোবায়দুল হক, বারিধারার কূটনৈতিক এলাকার ড. সৈয়দ সিরাজুল হক, ধানমন্ডি এলাকার শরীফ জহির, গুলশান এলাকার তারিক ইকরামুল হক, ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান হাসান মাহমুদ রাজা, একই গ্রুপের পরিচালক খন্দকার মঈনুল আহসান শামীম, পরিচালক আহমেদ ইসলাইল হোসেন, পরিচালক আক্তার মাহমুদ। এসব বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য বিএফআইইউ, এনবিআর ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়া হলেও এখনো জবাব পাওয়া যায়নি।

প্যারাডাইস পেপারস : ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্যারাডাইস পেপারসের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ সংবাদের প্রথম পর্বে ১০ জন ও দ্বিতীয় পর্বে ১৯ জনসহ ২৯ জনের নাম পাওয়া যায়। তারা হলেন-মাল্টিমোড লিমিটেডের আবদুল আউয়াল মিন্টু, একই প্রতিষ্ঠানের নাসরিন ফাতেমা আউয়াল, তাবিথ আউয়াল, তাফসির আউয়াল, তাজওয়ার মো. আউয়াল, নিউইয়র্কের তাইরন পিআইএর মোগল ফরিদা ওয়াই, যুক্তরাষ্ট্রের শহিদ উল্লাহ, বনানীর চৌধুরী ফয়সাল, বারিধারার আহমেদ সামির, ব্রোমার অ্যান্ড পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেড, ভেনাস ওভারসিস কোম্পানির মুসা বিন শমসের, বারিধারার ডায়নিক এনার্জির ফজলে এলাহী, ইন্ট্রিপিড গ্রুপের কেএইচ আসাদুল ইসলাম, খালেদা শিপিং কোম্পানির জুলফিকার আহমেদ, জেমিকো ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের তাজুল ইসলাম তাজুল, বেঙ্গল শিপিং লাইন্সের মোহাম্মদ মালেক, সাউদার্ন আইস শিপিং কোম্পানির শাহনাজ হুদা রাজ্জাক, ওসান আইস শিপিং কোম্পানির ইমরান রহমান, শামস শিপিং কোম্পানির মোহাম্মদ এ আউয়াল, উত্তরার এরিক জনসন আনড্রেস উইলসন, ইন্ট্রিডিপ গ্রুপের ফারহান ইয়াকুবুর রহমান, জেমিকো ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের তাজুল ইসলাম, পদ্মা টেক্সটাইলের আমানুল্লাহ চাগলা, নিউটেকনোলজি ইনভেস্টমেন্টের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান, মাল্টার মোহাম্মদ রেজাউল হক, জেমিকো ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মোহাম্মদ কামাল ভূঁইয়া, তুহিন-সুমন, সেলকন শিপিং কোম্পানির মাহতাবা রহমান, জেমিকো ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের ফারুক পালওয়ান ও গ্লোবাল এডুকেশন সিস্টেমের মাহমুদ হোসাইন।

এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দেশ থেকে পাচার করা টাকা সুইস ব্যাংকসহ বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে কারা রেখেছেন এর তালিকা চান হাইকোর্ট। একইসঙ্গে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তাও জানতে চাওয়া হয়।

এরও আগে ২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর দুদক, সিআইডি ও এনবিআর আদালতে অর্থ পাচারের বিষয়ে হাইকোর্টে প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। এতে উঠে আসে যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালীর নাম। সঙ্গে আসে ক্যাসিনো মমিনুল হক সাঈদের নামও। শতাধিক ব্যক্তির নামে প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের তথ্য দেয় দুদক। তবে এতে সন্তুষ্ট হননি আদালত। কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে যারা অবৈধ গাড়ি-বাড়ি তৈরি করেছেন তাদের বিষয়ে আদালত সুনির্দিষ্ট তথ্য চান। এজন্য এসব সংস্থাকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here