আ.লীগের দলীয় ও বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থীদের সহিংসতা

0
51

জেলার সুজানগরে নির্বাচনকে সামনে রেখে ধারাবাহিক সহিংসতার মুখে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন দুই থানার পুলিশ। প্রায় প্রতিদিনই আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনীত প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। সোমবার রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ইউনিয়নে সহিংসতায় গুলিবিদ্ধসহ কমপক্ষে ৩০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের জেরে এসব এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।

এদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্বের জেরে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সব ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী নামানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দলের একাংশের নেতারা। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সুজানগর উপজেলার ১০ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ১২ জন বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী মাঠে আছেন। স্বতন্ত্র নামের এসব বিদ্রোহী প্রার্থী দলের উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিভিন্ন পদে আছেন এবং দল থেকে বহিষ্কারের সুপারিশ করেও তাদেরকে মাঠ থেকে সরানো যায়নি। ৩১ অক্টোবর উপজেলা কমিটির বর্ধিত সভায় বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিদ্রোহী প্রার্থীরা মাঠে আছেন এবং প্রায় প্রতিদিনই উপজেলার কোনো না কোনো ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থীর সমর্থক ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এসব সংঘর্ষে আগ্নেয়াস্ত্রেরও ব্যবহার হচ্ছে। সোমবার রাতে ভায়না ইউনিয়নের চলনা বাজারে সংঘর্ষের ঘটনায় গুরুতর আহত দুজন নৌকা প্রার্থীর সমর্থককে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। রোববার রাতে উপজেলার মানিকহাট ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থী-সমর্থকদের সঙ্গে বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী-সমর্থকদের সংঘর্ষে তিনজন গুলিবিদ্ধসহ কমপক্ষে ১০ জন আহত হন। এ সময় নৌকা প্রতীক পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। হামলায় গুলিবিদ্ধদের মধ্যে ওই গ্রামের মিলন খানের ছেলে মোতালেব হোসেনকে (৩৮) পাবনা সদর হাসপাতালে এবং আব্দুল মজিদের ছেলে সাগর হোসেন (৩২) ও মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে ফজলুল হককে (৫৫) সুজানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। একইদিন হাটখালী ইউনিয়নে নৌকা অফিস ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানোর অভিযোগ উঠেছে ঘোড়া প্রতীকের বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর লোকজনের বিরুদ্ধে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ওই ইউনিয়নের স্বগতা বাজারে এ ঘটনা ঘটে। ৬ নভেম্বর সাগরকান্দি ইউনিয়নে নৌকা প্রতীক ও বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এ সময় বাড়িঘর লুটপাট, দোকান ও মোটরসাইকেল ভাঙচুরসহ গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটে। এর আগের দিন ভায়না এবং হাটখালী ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থী ও বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

এদিকে তাঁতীবন্ধ ইউনিয়নের বিএনপি সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুর রউফ শেখ (উপজেলায় একমাত্র বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী) অভিযোগ করে বলেন, সোমবার সকালে পোড়াডাঙ্গা বাজারে তার ভাতিজা ও চার নিকট আত্মীয়কে মারধর করেছে নৌকা প্রতীকে মতিন মৃধার লোকজন। এ ছাড়া তাকে কোনো প্রকার প্রচার চালাতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। এভাবে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায় উত্তেজনা বা সংঘর্ষের ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সুজানগর ও আমিনপুর থানার পুলিশকে নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে। আমিনপুর থানার অধীনে সুজানগরের ৩টি ইউনিয়ন এবং সুজানগর থানার অধীনে ৭টি ইউনিয়ন রয়েছে।

আমিনপুর থানার ওসি রওশন আলী বলেন, পরিস্থিতি এখনো পুলিশের নিয়ন্ত্রণে। তবু সব সময় তটস্থ থাকতে হয়। পাবনার পুলিশ সুপার মহিবুল ইসলাম খান বিপিএম বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ বদ্ধপরিকর। এদিকে সুজানগর উপজেলা আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব ও কোন্দলের জেরে সব ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে নামানো হয়েছে বলে দলের একাংশ অভিযোগ করেন। ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় উপজেলার রানীনগর ইউনিয়নের ভাটিকয়া বাজারে একটি মাইক্রোবাস থেকে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে আমিনপুর থানা পুলিশ। এ ঘটনায় আমিনপুর থানায় ৪ জনের নামে মামলা হয়েছে। এর আগে পুলিশ মাইক্রোবাসের চালক মো. হাবিবুল্লাহকে গ্রেফতার ও মাইক্রোবাসটি জব্দ করে। আমিনপুর থানার ওসি রওশন আলী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে একটি শটগান লাইসেন্স করা এবং সেটির মালিক সুজানগর পৌর এলাকার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হোসেন তোফা। অন্যটি ওয়ান শুটারগান এবং সেটি অবৈধ। মাইক্রোবাসের চালকের উদ্ধৃতি দিয়ে পুলিশ জানায়, সুজানগর পৌরসভার কাউন্সিলর জায়েদুল হক জনি (৩৫) জব্দ করা মাইক্রোবাসে অস্ত্র দুটি বহন করছিল। জনি মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হোসেন তোফার ছেলে। সুজানগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল ওহাবের অভিযোগ, ২য় ধাপের নির্বাচনে সুজানগরের ১০টি ইউনিয়নে উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শাহিনুজ্জামান শাহিনের নিজস্ব লোক মনোনয়ন না পাওয়ায় দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে প্রতি ইউনিয়নে বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী দিয়েছেন। তিনি এসব ইউনিয়নে নৌকার ভোটারদের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টির পাঁয়তারায় তার লোকজন দিয়ে এসব অস্ত্র ব্যবহার করছেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহিনুজ্জামান শাহিন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসব বিদ্রোহী প্রার্থী আমার নয়, বরং আব্দুল ওহাবেরই সমর্থক। কেননা, তারা আমার সঙ্গে কখনো রাজনীতি করেনি।

সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে সভা : সর্বশেষ মঙ্গলবার বিকালে সুজানগরে রাজশাহী বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) জিয়াউল হক সব প্রার্থী এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন। যুগান্তরের সুজানগর প্রতিনিধি জানান, বৈঠকে যে কোনো উপায়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়। বৈঠকে পাবনার জেলা প্রশাসক বিশ্বাস রাসেল হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) মাসুদ আলম, জেলার সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা মাহবুবুর সরহমান, সুজানগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রওশন আলীসহ সুজানগর ও আমিনপুর থানার ওসি উপস্থিত ছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here