মদ চুরির পথ খোলা রাখতে দৌড়ঝাঁপ

0
71

শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা মদ-বিয়ার খোলাবাজারে বিক্রি বন্ধ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় মদ-বিয়ার আমদানি ও বিক্রির হিসাব রাখতে এনবিআর একটি সফটওয়্যার চালু করে। কিন্তু চুরির পথ খোলা রাখতে সেই সফটওয়্যার ব্যবহার করতে নারাজ ডিপ্লোমেটিক বন্ডের ওয়্যারহাউজগুলো। নিরাপত্তার অজুহাতে ৬টি প্রতিষ্ঠান একযোগে সফটওয়্যার ব্যবহার না করতে বিভিন্ন মহলে তদবির ও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে। অন্যদিকে সফটওয়্যার ব্যবহার করে মদ-বিয়ার বিক্রির আগ্রহ প্রকাশ করায় নতুন ৩টি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

গত ২০ সেপ্টেম্বর এনবিআরের এক আদেশে বলা হয়েছে, প্রতিটি ডিপ্লোমেটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউজকে পণ্য মদ-বিয়ার আমদানিসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য যেমন বিল অব এন্ট্রি নম্বর, অফিস কোড, ইনভয়েস নম্বর, আমদানি করা পণ্যের ব্র্যান্ড ও নাম, পরিমাণ, সিআইএফ মূল্য সফটওয়্যারে এন্ট্রি করতে হবে। একই সঙ্গে পণ্য বিক্রয়ের সময় সফটওয়্যারে লগইন করে কূটনৈতিক বা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তির পাশবুক অথবা কর অব্যাহতির সনদ নম্বর এবং পাসপোর্টের তথ্য যাচাই করে বরাদ্দ অনুযায়ী পণ্য বিক্রি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি এক্স বন্ড নম্বর, বিক্রীত পণ্যের নাম, পরিমাণ, বিল অব এন্ট্রি নম্বর, সিআইএফ মূল্য সিস্টেমে এন্ট্রি করতে হবে।

আদেশে আরও বলা হয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশি কূটনীতিক ও সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রাপ্যতার ভিত্তিতে চাহিদা মোতাবেক পণ্য সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট তথ্য ডিপ্লোমেটিক বন্ড অটোমেশন সিস্টেমে আপলোড করবে। একই সঙ্গে সিস্টেম থেকে পাওয়া ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরযুক্ত কর অব্যাহতি সনদ তাদের জন্য প্রস্তুত করবে। অর্থাৎ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কূটনীতিক বা সুবিধাপ্রাপ্ত প্রয়োজনীয় মদ-বিয়ার, সিগারেটসহ যাবতীয় পণ্যের তথ্য এনবিআরের সিস্টেমে আপলোড করতে হবে। সে অনুযায়ী পণ্য বিক্রির সময় ডিপ্লোমেটিক বন্ডগুলো পণ্য সরবরাহ করে তা সিস্টেমে আপলোড করবে।

এনবিআর সূত্র জানায়, ডিপ্লোমেটিক বন্ডের মদ-বিয়ার বিক্রিতে স্বচ্ছতা আনতে দীর্ঘদিন যাবৎ এনবিআর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর অংশ হিসাবে একটি সফটওয়্যার প্রস্তুত করা হয়। সফটওয়্যার ব্যবহারে বন্ডেড প্রতিষ্ঠানগুলোকে একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। উলটো সিস্টেমের নানা কারিগরি ত্রুটি তুলে ধরে সফটওয়্যার ব্যবহারে অপারগতা প্রকাশ করে এবং বিভিন্ন মহলে তদবির শুরু করেছে।

এ বিষয়ে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গত ১ অক্টোবর থেকে ডিপ্লোমেটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউজগুলোর সফটওয়্যার ব্যবহারে নির্দেশনা থাকলেও তারা আদালতে রিট করেছে। তাই সফটওয়্যারটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সফটওয়্যার চালুর আগে ডিপ্লোমেটিক বন্ডগুলোর সঙ্গে এনবিআর ও ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট কয়েক দফা বৈঠক করে। বৈঠকে ডিপ্লোমেটিক বন্ডগুলোর পক্ষ থেকে প্রায় একই ধরনের আপত্তির কথা জানানো হয়। যেমন টস বন্ড থেকে বলা হয়, সফটওয়্যারটিতে এক বন্ডের স্টক অন্য বন্ড দেখতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক গোপনীয়তা ভঙ্গ হয়, যা ব্যবসার জন্য হুমকিস্বরূপ। এছাড়া আরও বলা হয়, সফটওয়্যার চালু করার পর কম্পিউটারের ইউআরএলে ‘নট সিকিউরড’ দেখা যায়। যা প্রতিষ্ঠান ও কূটনীতিকদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে কূটনীতিক ও সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস ও বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের তথ্য ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকবে। এছাড়া সফটওয়্যারটির প্রযুক্তিগত অনুমোদন বা নিবন্ধনের ঘাটতি আছে কিনা-সে বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার।

একইভাবে সাবের ট্রেডার্সের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে বলা হয়, এ ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহারে প্রতিষ্ঠানটির কারিগরি দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা খুবই সীমিত। অপরদিকে যেসব ব্যক্তির কাছে পণ্য বিক্রি করা হয় তারা অত্যন্ত সম্মানীয়, স্থানীয় আইনের ঊর্ধ্বে ও দায়মুক্তিপ্রাপ্ত। এ ধরনের ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায় সফটওয়্যারটি কতটুকু কার্যকর তা যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ ভবিষ্যতে তৃতীয় পক্ষ দ্বারা কূটনীতিকদের তথ্য বেহাত বা অপব্যবহার হলে জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। সেই পরিস্থিতি কীভাবে উত্তরণ করা হবে তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

ইস্টার্ন ডিপ্লোমেটিক সার্ভিসের পক্ষ থেকে বলা হয়, সফটওয়্যারে হালনাগাদকৃত কর অব্যাহতি সনদ প্রদর্শিত হচ্ছে না। সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা যাচ্ছে না। যার ফলে সফটওয়্যারটিতে বর্তমান ভার্সন ব্যবহার সম্ভব নয়। এছাড়া কারিগরি দিক পর্যালোচনা এবং সামগ্রিক সুরক্ষা ব্যবস্থা (ফায়ারওয়াল) সুনিশ্চিত করার জন্য সফটওয়্যারটি প্রয়োজনীয় মানদণ্ড নির্ধারণী শর্ত উত্তীর্ণ কিনা সেটি কারিগরি খাতে অনুমোদিত বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা ও সুরক্ষামান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এছাড়া সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া কয়েকটি হ্যাকিংয়ের ঘটনা উল্লেখ করেছে ডিপ্লোমেটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউজগুলো। যেমন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্ভার হ্যাক করে অর্থ পাচার, চট্টগ্রাম কাস্টমসের কর্মকর্তার আইডি-পাসওয়ার্ড হ্যাক করে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি, সুপার শপ স্বপ্নের ভাউচার হ্যাক করে লাখ লাখ টাকা গায়েব, বিকাশের পাসওয়ার্ড হ্যাক করে টাকা আত্মসাৎ, সার্ভার সমস্যার কারণে পাসপোর্ট সরবরাহ বন্ধ এবং অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সার্ভার ডাউনের কারণে পণ্য খালাস বন্ধ হয়ে যায়।

অবশ্য এনবিআরের সিস্টেম ম্যানেজার জাহিদ হোসেন বলছেন, সফটওয়্যারের সিকিউরিটি নিয়ে ডিপ্লোমেটিক বন্ডের প্রশ্নগুলো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এনবিআরের ডাটা সেন্টারে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সব সিকিউরিটি ফিচার রয়েছে। অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। এ ডাটা সেন্টার থেকে কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সফটওয়্যার পরিচালিত হয়। তাছাড়া ডিপ্লোমেটিক বন্ডের সফটওয়্যার তো জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য নয়। এটি ব্যবহার করবে এনবিআর, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ডিপ্লোমেটিক বন্ডগুলো। এখান থেকে তথ্য চুরির শঙ্কা অমূলক, ভিত্তিহীন।

দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। এনবিআরের আরও আগে খোলাবাজারে মদ-বিয়ার বিক্রি বন্ধে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। ডিপ্লোমেটিক বন্ডগুলো সিকিউরিটির ভুয়া অভিযোগ তুলে সফটওয়্যার ব্যবহার করতে না চাইলে এনবিআরের উচিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। সফটওয়্যারে যদি কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকে তবে সেটি ঠিক করে যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করা উচিত। এক্ষেত্রে যত বাধা-বিপত্তি আসুক কেন, সেগুলো মোকাবিলা করলে এ খাতে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

আরও ৩ প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে লাইসেন্স : সফটওয়্যার মেনে ব্যবসা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ৩টি প্রতিষ্ঠান। এগুলো হচ্ছে-পর্যটন করপোরেশন, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এবং হোটেল সোনারগাঁও। এসব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বন্ড লাইসেন্স দেওয়ার কার্যক্রম চলমান আছে। শিগগিরই এসব প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here