দল পুনর্গঠনে নেতৃত্বে আনা হচ্ছে যোগ্যদের

0
120

ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের খোলনলচে বদলে যাচ্ছে। সৎ, যোগ্য ও ত্যাগী নেতাকর্মীর সমন্বয়ে দলের প্রতিটি স্তর ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কাজও শুরু করেছেন দায়িত্বশীল নেতারা। শহর আওয়ামী লীগের কমিটি বাতিল ছাড়াও কয়েকটি অঙ্গ সংগঠনের কমিটি বাতিল, স্থগিত ও পুনর্গঠন করা হয়েছে। ব্যাপক রদবদলের মাধ্যমে প্রতিটি কমিটিতে যোগ্যদের ঠাঁই দেওয়া হচ্ছে। এই প্রচেষ্টাকে সবাই সাধুবাদ জানিয়েছেন।

গত বছর জুনে পুলিশের বিশেষ অভিযানে গ্রেফতার হন ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি নাজমুল ইসলাম খন্দকার লেভি ও সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বরকত। পরবর্তী সময়ে এই দুজনের বিরুদ্ধে ২ হাজার কোটি টাকার মানি লন্ডারিংয়ের মামলা হয়। এ অভিযোগে তাদের দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়। নাজমুল ইসলাম খন্দকার লেভি প্রকৃত আওয়ামী লীগার হলেও দলের হাইব্রিড নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি অবৈধ পন্থায় গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এমনটিই মনে করেন দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। মানি লন্ডারিং মামলার আরেক আসামি বিল্লাল হোসেন ছিলেন সাবেক মন্ত্রীর ভাই খন্দকার মোহতেশাম হোসেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। মন্ত্রীর ভাই উপজেলা চেয়ারম্যান পদ হারানোর পর বিল্লাল হোসেন এলাকা ছেড়ে নিজেকে আড়াল করেন। তবে ঈদে বাড়ি এলে তাকে আটক করা হয়। এছাড়া আসিবুর রহমান ফারহানও মানি লন্ডারিং মামলার আসামি। তিনি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। সম্প্রতি ঈদে বাড়ি এলে মানি লন্ডারিং মামলায় তাকেও গ্রেফতার করা হয়। ঢাকার কাফরুল থানায় দায়ের করা মানি লন্ডারিংয়ের মামলায় একে একে গডফাদারদের অনেকে ধরা পড়েন।

এদিকে শহর আওয়ামী লীগ, জেলা ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতারা গ্রেফতার ও আটক হওয়ার পর কমিটির কর্মকাণ্ড একরকম মুখ থুবড়ে পড়ে। এরপর চলতি বছরের পহেলা সেপ্টেম্বর কেন্দ্র থেকে এক চিঠির মাধ্যমে মনিরুল হাসান মিঠুকে আহ্বায়ক করে শহর আওয়ামী লীগের ৬৩ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয় তিনজনকে। তারা হলেন সাইদ উদ্দিন আহমেদ, মনিরুজ্জামান মনির ও অ্যাডভোকেট বদিউজ্জামান বাবুল। এ কমিটি ফরিদপুরের আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে নতুনভাবে এগিয়ে নিতে কাজ করছে। সম্প্রতি দেশের কয়েকটি স্থানে মন্দিরে হামলার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদে নবগঠিত কমিটির নেতৃত্বে শহরে বড় ধরনের মিছিল ও সমাবেশ হয়।

পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক মনিরুল হাসান মিঠু যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দল ক্ষমতায় থাকলেও দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে চলতে হয়েছে। আগের কমিটি স্থবির ছিল। বহু বাধাবিপত্তি ও নানা অপশক্তি মোকাবিলার একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে নতুন কমিটি করা হয়েছে। এখন দলকে সুস্থ পরিবেশে গতিশীল ও শক্তিশালী করতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। নতুন কমিটির সবাই কর্মঠ এবং তাদের প্রত্যেকের ইতিবাচক রাজনৈতিক ক্যারিয়ার রয়েছে। আমরা কয়েকটি সফল কর্মসূচিও করেছি।’

এদিকে জেলা ছাত্রলীগের আগের কমিটির কয়েকজন নেতা ১১ বছরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। পুলিশের শুদ্ধি অভিযানে তাদের কয়েকজন আটক হওয়ার পর জেলা ছাত্রলীগ দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ফরিদপুর ছাত্রলীগের কমিটি বাতিল ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯ জানুয়ারি তামজিদুল রশিদ চৌধুরীকে (রিয়ান) সভাপতি এবং মো. ফাহিম আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে ২৫ সদস্যবিশিষ্ট ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের আংশিক নতুন কমিটির পর্দা উন্মোচিত হয়। এ কমিটি আগের দুর্নাম ঘুচিয়ে নতুনভাবে দলকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে।

এ বিষয়ে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তামজিদুল রশিদ চৌধুরী রিয়ান যুগান্তরকে বলেন, ‘নতুন কমিটি ঘোষিত হওয়ার পর জেলার ৮ উপজেলায় ছাত্রলীগের অধিকাংশ কমিটি গঠিত হয়েছে। ফলে সংগঠনে গতি ফিরেছে। বিভিন্ন মিটিং-মিছিলে নেতাকর্মীদের ব্যাপকভাবে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা গেছে। আমরা দলকে এগিয়ে নিতে একযোগে কাজ করে যাচ্ছি।’

এছাড়া ফরিদপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফাহাদ বিন ওয়াজেদ ফাইনকে দুই হাজার কোটি টাকার মানি লন্ডারিং মামলায় পাটুরিয়া ঘাট এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই ঘটনার পর ৪ জুন আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দলীয় বিভাজন ভুলে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মাঠে সক্রিয় থাকার জন্য নেতারা আহ্বান জানান।

স্বেচ্ছাসেবক লীগের জেলা শাখার সভাপতি শওকত আলী জাহিদ যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কমিটির সাধারণ সম্পাদক গ্রেফতার হওয়ার পর যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহম্মেদ দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে কমিটি শক্তিশালী হয়েছে। করোনাকালীন আমরা দরিদ্র মানুষকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছি। জেলার শান্তি রক্ষায় মিছিল করেছি। এছাড়া প্রথম সারির বেশির ভাগ নেতা গ্রেফতার হলেও সেই আগের হেলমেট বাহিনী এখনো রয়ে গেছে। তারা কোনো না কোনোভাবে ফের দলে ঢোকার চেষ্টা করছে। তাদেরকে দলের বাইরে রাখতে মূল দলের সিনিয়র নেতাদের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’

এদিকে ফরিদপুর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটি চলতি বছরের ৯ সেপ্টেম্বর কেন্দ্র থেকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাফিয়া খাতুন ও সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা বেগম স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সূত্রমতে, সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন করে মহিলা দলের কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শামসুল হক (ভোলা মাস্টার) যুগান্তরকে বলেন, ‘ফরিদপুর সদর আসনের এমপি যখন মন্ত্রীর দায়িত্ব পান, তারপর তিনি নিজেই হাইব্রিড নেতাদের দলে টানতে শুরু করেন। কারণ, তাদের দিয়ে বিভিন্ন অফিস ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছিলেন। আমরা ত্যাগী নেতারা থাকলে তিনি সুবিধা করতে পারবেন না বলে নানা উপায়ে আমাদের দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন। এসব কারণে দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর পর তাদের পতন হলেও দলের মধ্যে পুরোপুরি শান্তিশৃঙ্খলা এখনো ফিরে আসেনি।’

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুবল চন্দ্র সাহা যুগান্তরকে বলেন, ‘বড় একটি দলের মধ্যে সব সময় কিছু মতবিরোধ থাকতে পারে। তবে আমরা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সেসব বাধা উপেক্ষা করে দলকে সামনে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here