সেই সৈকত মণ্ডল কারমাইকেল কলেজের ছাত্র নয়

0
124

রংপুরের পীরগঞ্জের সহিংসতার ঘটনায় মূলহোতা সৈকত মণ্ডল সরকারি কারমাইকেল কলেজের দর্শন বিভাগের ছাত্র ছিলেন না। কলেজের দর্শন বিভাগ ও কলেজ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

সৈকত মূলত পরিচয় গোপন রেখে কলেজের ছাত্রলীগের কমিটিতে যুক্ত হন। এরপর ওই কলেজের দর্শন বিভাগের ছাত্রলীগের দাপুটে নেতা হিসেবে সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন।

তার রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েব সাইটে অনুসন্ধান করে দেখে গেছে, সৈকত মণ্ডল রংপুর সরকারি কলেজের ২০১৫-১৬ শিক্ষা বর্ষের দর্শন বিভাগের ছাত্র। তার রোল নম্বর-৯১০২৪০৯ ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর ছিল-১৫২১৭১১২৩৯২। কলেজ কোড-৩২০৭। ২০১৯ সালের চতুর্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় তিনি জিপিএ ৩ দশমিক ১০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

এ নিয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কলেজ ও মহানগর কমিটির নেতারা পরস্পরবিরোধী কথা বলেন। পীরগঞ্জের হিন্দুপাড়ায় সহিংস ঘটনার পর ছাত্রলীগের মহানগর কমিটি ও কারমাইকেল কলেজ শাখা কমিটির দেওয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সৈকত সম্পর্কে সংগঠনের পক্ষ থেকে বিষয়টি আড়াল করতে নানা অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

ছাত্রলীগ কারমাইকেল কলেজ ও মহানগর কমিটি বলছে, সৈকত পরিচয় গোপন করে সংগঠনে অনুপ্রবেশ করেছিল।

কারমাইকেল কলেজের দর্শন বিভাগের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করে বলেন, কারমাইকেল কলেজে তার সরব উপস্থিতি ছিল। ছিল দাপুটে ছাত্রলীগ নেতা। যে কোনো কাজে সবার আগে উপস্থিত থাকতেন তিনি।

তবে ২০১৭ সালের স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় সরকারি কারমাইকেল কলেজের তৃতীয় ভবনের ২০৮ নম্বর কক্ষে রংপুর সরকারি কলেজের হয়ে সৈকত মণ্ডলকে পরীক্ষার হলে দেখে কর্তব্যরত শিক্ষক-কর্মকর্তারা বিষয়টি হতবাক হন। পরে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু ছাত্রলীগ নেতা হওয়ায় কিছু বলার সাহস পাননি কলেজের দর্শন বিভাগের শিক্ষক ও কলেজ কর্তৃপক্ষ।

কারমাইকেল কলেজের দর্শন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. বশিরুল হাসান সরকার জানান, সৈকত কারমাইকেল কলেজের দর্শন বিভাগের ছাত্র নয়। কখনো ক্লাসে দেখিনি। তবে সে এখানে খুব ঘোরাঘুরি করতো। তার রেজাল্ট সিটে দেখেছি সে রংপুর সরকারি কলেজের ছাত্র। ছাত্রলীগ নেতা হওয়ায় এ নিয়ে আর কোনো কথা বলিনি।

রংপুর সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আবু জুবায়েদ খানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি।

গেল ১৭ অক্টোবর পীরগঞ্জে হিন্দু মাঝিপাড়ায় সহিংসতার ঘটনার পর গোপনে পালিয়ে যান সৈকত মণ্ডল। তাকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পালিয়ে যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। এ কথা জানিয়েছেন সৈকতের বাবা-মা। একই সঙ্গে ঘটনার দিন চেয়ারম্যানের সঙ্গে সৈকত ও দুদু মাস্টারের ছেলে লিয়ন ছিল।

সৈকতকে র্যা ব গাজীপুরের টঙ্গী থেকে প্রথম আটক করে। পরে র্যা বের ডিএডি আব্দুল আজিজ বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে এবং গ্রেফতার দেখানো হয়। মামলাটি তদন্ত করছেন পীরগঞ্জ থানার এসআই সুদীপ্ত শাহীন। লিয়ন পলাতক রয়েছে পুলিশ তাকে খুঁজছে বলে রংপুরের পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার সরকার জানিয়েছেন।

গ্রেফতারের পর পীরগঞ্জের ঘটনায় তাকে মূলহোতা বলে সৈকতকে চিহ্নিত করে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে র্যা ব। এ ঘটনার পর ব্যাপক আলোচনায় আসেন সৈকত মণ্ডল বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতারা।

এদিকে মঙ্গলবার রংপুর মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি মো. শফিউর রহমান স্বাধীন ও শেখ আসিফ হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তি এসেছে এই প্রতিনিধির হাতে।

তাতে উল্লেখ করা হয়েছে- সৈকত মণ্ডল, পিতা রাশেদুল হক, মাতা আঞ্জুয়ারা বেগম, রেজিস্ট্রেশন নম্বর-১৫২১৭১১২৩৯২, পরীক্ষার রোল নম্বর-৯১০২৪০৯, সেশন-২০১৫-২০১৬, বিভাগ-দর্শন, কলেজ কোড-৩২০৭, রংপুর সরকারি কলেজের ছাত্র।

তাকে গত ২২-১০-২০২১ তারিখে গাজীপুরের টঙ্গী থেকে গ্রেফতার করা হয়। একটি কুচক্রী মহল উক্ত ব্যক্তিকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে গুজব ও অপপ্রচার করার চেষ্টা করছে।

মূলত সে তার ছাত্রত্ব পরিচয় গোপন রেখে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কারমাইকেল কলেজ শাখার আওতাভুক্ত দর্শন বিভাগ শাখার সহ-সভাপতি পদে কৌশলে অনুপ্রবেশ করে। কারমাইকেল কলেজ শাখার তৎকালীন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক অনেক পূর্বেই তথ্য গোপন ও দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে। বিভিন্ন রকম বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সংগঠনে অনুপ্রবেশ করে ষড়যন্ত্র করাই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। এমন অনুপ্রবেশকারী অপরাধীর দায় সংগঠনের হতে পারে না।

রংপুর মহানগর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নথিপত্রে দেখা যায়- ২০১৭ সালের ৮ মে কারমাইকেল কলেজ ছাত্রলীগ দর্শন বিভাগ ছাত্রলীগের যে কমিটির অনুমোদন দিয়েছে তাতে ওই কমিটির ১ নম্বর সহ-সভাপতি ছিলেন সৈকত মণ্ডল।

কারমাইকেল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের (সদ্য বিলুপ্ত) সাইদুজ্জামান সিজার জানান, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে সৈকত মণ্ডলকে ১৮ অক্টোবর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।

ছাত্রত্বের বিষয়ে সিজার জানান, সে তো নিয়মিত কলেজে ক্লাস করেছিল। কলেজে থাকতো। তাই সে কমিটিতে স্থান পেয়েছে।

রংপুর মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আসিফ হোসেন প্রেস রিলিজের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, প্রেস রিলিজ আমরা দিয়েছি। সৈকত কারমাইকেল কলেজের ছাত্র নয়। সে কৌশলে ভুল তথ্য দিয়ে প্রবেশ করেছে। সে অনুপ্রবেশকারী। কলেজ কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় আমরা কমিটি বিলুপ্ত করেছি। সে রংপুর সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগের ছাত্র। কিন্তু রংপুর কলেজ ছাত্রলীগে তার কোনো নাম নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here