১৮ মাস পর ক্লাসে ফিরে উচ্ছ্বসিত ঢাবি শিক্ষার্থীরা

0
77

করোনাভাইরাসের কারণে ১৮ মাস বন্ধ থাকার পর রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সশরীরে শ্রেণি কার্যক্রম (ক্লাস-পরীক্ষা) শুরু হয়েছে। যেসব শিক্ষার্থী অন্তত এক ডোজ টিকা নিয়েছেন, তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস করেছেন। দীর্ঘদিন পর ক্লাসে ফিরতে পারায় তারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হলে গত বছরের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রশাসন সশরীরে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তবে একই বছরের জুলাইয়ে অনলাইনে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হয়। স্নাতক শেষবর্ষ ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নিতে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি ঢাবি প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয়। ১৩ মার্চ থেকে হল খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে স্নাতক শেষবর্ষ ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের জন্য ৫ অক্টোবর থেকে আবাসিক হল খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর করোনা সংক্রমণের হার হ্রাস পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের এক ডোজ টিকা নেওয়ার শর্তে ১৭ অক্টোবর থেকে ঢাবিতে সশরীরে ক্লাস শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল। আর এরই ধারাবাহিকতায় রোববার সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে সশরীরে ক্লাস শুরু হয়।

সরেজমিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ও বিজ্ঞান অনুষদ ঘুরে দেখা যায়, প্রবেশপথে শিক্ষার্থীদের শরীরের তাপমাত্রা মাপা হচ্ছে এবং যারা মাস্ক পরেননি তাদের মাস্ক দেওয়া হচ্ছে। এ সময় টিকা কার্ড না দেখেই অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে ভবনে প্রবেশ করতে দেখা যায়। সকাল ৮টা থেকে ক্লাস শুরু হয়। যেসব ক্লাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি ছিল, সেখানে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থীদের দুই ভাগ করে পর্যায়ক্রমে ক্লাস নেওয়া হয়। প্রথম দিন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

দীর্ঘদিন পর ক্লাসে ফেরার অনুভূতি জানতে চাইলে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী শাকিল মাহমুদ বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস করেছি। দীর্ঘদিন পর বন্ধুদের পেয়ে অনেক বেশি ভালো লাগছে। অনলাইন ক্লাস আর অফলাইনে অনেক পার্থক্য। বন্ধু ও শিক্ষকদের কাছ থেকে দেখা আনন্দের। তাই অনেকদিন পর ক্লাস করতে পেরে ভালোলাগা কাজ করছে। আশা করি, এবার ঠিকভাবে সবকিছু শেষ করতে পারব। লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাইলে আরও আগে আমাদের ক্লাস নিতে পারত। দীর্ঘদিন পর হলেও ক্লাস করতে পেরে ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছি। আশা করি কর্তৃপক্ষ সেশনজট রোধে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখবে।

বিজ্ঞান অনুষদের ডিন (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম যুগান্তরকে বলেন, শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিতে আমরা আগে থেকেই সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি। আর সবকিছু আমাদের পরিকল্পনামতোই হয়েছে। আমরা শিক্ষার্থীদের মিষ্টি ও চকলেট দিয়ে বরণ করে নিয়েছি। তারাও স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন।

ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বাহাউদ্দিন বলেন, শিক্ষার্থীদের পেয়ে শিক্ষকদের মনেও আনন্দ ফিরেছে। তাই আমরা প্রথমদিনেই তাদের জন্য ক্লাস রেখেছি। যে ঘাটতি হয়েছে, সেটা আমরা পুষিয়ে নিতে চেষ্টা করব।

এদিকে বেলা ১১টার দিকে কলাভবনের বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষা কক্ষ পরিদর্শন করেন ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন কলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. সৈয়দ আজিজুল হক, ঢাবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. নিজামুল হক ভূইয়া, প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানী প্রমুখ। স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হওয়ায় উপাচার্য ড. আখতারুজ্জামান সন্তোষ প্রকাশ করেন। ঢাবির শতভাগ শিক্ষার্থী কোভিড-১৯-এর অন্তত এক ডোজ টিকা গ্রহণ করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় খোলার নানা ধাপ ও পদক্ষেপ সশরীরে ক্লাস শুরু হওয়ার মাধ্যমে তা পূর্ণতা পেল। একটি বিষয় খুবই আশাব্যঞ্জক যে ক্লাসে অংশগ্রহণকারী সবাই টিকা নিয়েছেন। সবাই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন। এটি অন্যসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং দেশে করোনা পরিস্থিতি উন্নতিতে সহায়তা করবে। তিনি আরও বলেন, ঘাটতি পূরণে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। কারণ, আমরা চাই শিক্ষার্থীদের যে সময়টুকু নষ্ট হয়েছে, সে সময়টুকু যেন আমরা পুনরুদ্ধার করতে পারি। কম সময়ে অধিক কাজ করে, শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা, পরীক্ষা গ্রহণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে সময়সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

স্লোগানে স্লোগানে মুখর মধুর ক্যান্টিন: দীর্ঘদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস হওয়ার আনন্দ শুধু শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ ছিল না, আড্ডা-গল্পে এ আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে মধুর ক্যান্টিন, টিএসসিসহ পুরো ক্যাম্পাসে। ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মুহুর্মুহু স্লোগানে ক্যাম্পাস মুখরিত হয়ে ওঠে। স্লোগান দিয়ে তারা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। এরপর সংক্ষিপ্ত সমাবেশে নেতারা বক্তব্য দেন।

সকাল ৯টার দিকে মধুর ক্যান্টিনে ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। এ সময় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি রাকিব হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক বাঁধনসহ বিভিন্ন হলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

দেড় বছরের বেশি সময় পর মধুর ক্যান্টিনে আসে ছাত্রদল। তবে আগে থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ক্যান্টিন নিজেদের দখলে রাখায় সেখানে বসতে পারেনি তারা। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, সকাল ১০টায় মধুর ক্যান্টিনে আসেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তবে সেখানে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অবস্থানের কারণে ক্যান্টিনের ভেতরে তারা ঢুকতেই পারেননি। ক্যান্টিনের পাশে আইবিএ ভবনের সামনে তারা অবস্থান নেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছাত্রদলের সভাপতি আসার পর নেতাকর্মীদের একটি অংশ মধুর ক্যান্টিনে অবস্থান নেয়। এরপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মুহুর্মুহু স্লোগান শুরু করেন। একপর্যায়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্যান্টিন থেকে বের হয়ে যান। পরে তারা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়কে শোডাউন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাচ চত্বরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রদল সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, সিনিয়র সহসভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ, সহসভাপতি আশরাফুল আলম ফকির লিংকন, যুগ্মসম্পাদক আরিফুল হক, মাহবুব মিয়া, রিয়াদ ইকবাল, নিজাম উদ্দিন রিপন, শরিফুল ইসলাম, সুলতানা জেসমিন জুঁই প্রমুখ।

মধুর ক্যান্টিনে আসার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, অনেকদিন আমরা মধুর ক্যান্টিনে আসিনি। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে সোচ্চার ছিলাম। এ সময় মধুর ক্যান্টিনের যে রাজনীতিচর্চা, সেটি আমরা করিনি। এখন থেকে আমরা এটি শুরু করলাম। সামনেও এটি অব্যাহত থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here