নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা দেননি অর্ধেক শিক্ষক

0
79

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ থেকে গবেষণা প্রকল্প পেলেও নির্ধারিত সময়ে সেগুলোর প্রতিবেদন জমা দিচ্ছেন না রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। বিশ্ববিদ্যালয়টির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, অর্ধেক শিক্ষক তাদের গবেষণা প্রকল্পের প্রতিবেদন নির্ধরিত সময়ে জমা দেননি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গবেষণার প্রকল্প নেওয়ার পর অনেক শিক্ষকের শিক্ষা ছুটিতে চলে যাওয়া, যৌথ প্রকল্পে মতবিরোধ, গবেষণার বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় করা প্রভৃতি কারণে প্রকল্পের প্রতিবেদন জমাদানে বিলম্ব হয়। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও প্রকল্প শেষ করতে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ১২২ জন শিক্ষককে যৌথ ও এককভাবে ৯৮টি গবেষণা প্রকল্প দেওয়া হয়। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৪ কোটি ৩১ লাখ ১০ হাজার টাকা। সেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গবেষণা শেষ হয়েছে ৪৯টি প্রকল্পের। বাকি ৪৯টি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। কলা অনুষদে ১৬টি গবেষণা প্রকল্পের বিপরীতে ২২ জন শিক্ষক গবেষণার কাজে সুযোগ পান। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৭৭ লাখ ৫২ হাজার ৭৫১ টাকা। এতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৬টি প্রকল্পের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। বাকি ১০টি প্রকল্প জমা দেননি গবেষকরা। বিজনেস স্টাডিজ অনুষদে ১৪টি প্রকল্পে ১৯ জন শিক্ষক কাজের সুযোগ পান। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩৯ লাখ ১৫ হাজার ৫৩১ টাকা। এতে ৪টি প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়ে জমা দেওয়া হয়। বাকি ১০টি প্রকল্প জমা দেওয়া হয়নি। সমাজবিজ্ঞান অনুষদে ১১টি প্রকল্পে সুযোগ পান ১৭ জন শিক্ষক। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৬৬ লাখ ১৭ হাজার ২৪৭ টাকা। এর মধ্যে ৭টি প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়ে জমা দেন গবেষকরা। বাকি ৪টি জমা দেননি। জীব ও ভূ-বিজ্ঞান অনুষদে ৮টি প্রকল্পে ৯ জন শিক্ষক সুযোগ পান। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৫৯ লাখ ১২ হাজার ৪৫২ টাকা। এতে ৩টি প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়ে জমা দেন। বাকি ৫টি জমা দেননি। প্রকৌশল অনুষদে ৭টি প্রকল্পের বিপরীতে ১০ জন শিক্ষক গবেষণা কাজের সুযোগ পান। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৪৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৫০ টাকা। নির্দিষ্ট সময়ে গবেষণা শেষ করেছেন ৬টি এবং ১টি শেষ করা হয়নি। চারুকলা অনুষদে ১টি প্রকল্পে ২ জন শিক্ষক সুযোগ পান। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৩ লাখ ৭০ হাজার ৪৩৬ টাকা। সেটি নির্দিষ্ট সময়ে জমা দেওয়া হয়েছে। কৃষি অনুষদে ৬টি প্রকল্পে কাজের সুযোগ পান ৬ জন শিক্ষক। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩১ লাখ ৭১ হাজার ৫৮০ টাকা। নির্দিষ্ট সময়ে জমা দেওয়া হয় ৫টি প্রকল্প আর ১টি নির্দিষ্ট সময়ে জমা দেওয়া হয়নি। বিজ্ঞান অনুষদে ৩১টি প্রকল্পে ৩৩ জন শিক্ষক গবেষণা কাজে অংশ নেন। সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৮৮ লাখ ৪৯ হাজার ১০০ টাকা। এর মধ্যে ১৪টি প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়ে জমা দেওয়া হয়। বাকি ১৭টি নির্দিষ্ট সময়ে জমা দেওয়া হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাবি প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, অনেক শিক্ষক গবেষণা প্রকল্প নিয়ে শেষ করতে পারেন না। ছুটি নিয়ে বিদেশে চলে যান। প্রতিবেদন জমাও দেন না। আবার গবেষণার আপডেট জানান না।

গবেষণা কার্যের নীতিমালা অনুযায়ী একজন গবেষক গবেষণাকর্মে এককভাবে দুই লাখ টাকা এবং যৌথভাবে সর্বোচ্চ চার লাখ টাকা পাবেন। গবেষণা প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় এক বছর। কোনো শিক্ষক নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিবেদন জমা না দিলে তাকে দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে না। প্রদেয় টাকা ফেরত না দিলে ওই শিক্ষকের পেনশন থেকে কর্তন করা হবে। প্রথমবার গবেষণা প্রকল্প যথাযথভাবে শেষ না করলে পরবর্তী সময়ে ওই শিক্ষককে গবেষণার কাজ দেওয়া হবে না।

গবেষণা প্রকল্পের প্রতিবেদন জমা না দেওয়ার কারণ সম্পর্কে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর বিশিষ্ট গবেষক ড. মনজুর হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের শুধু পাঠদান করাই দায়িত্ব নয়; গবেষণায় অবদান রাখাও বড় দায়িত্ব। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জুনিয়র শিক্ষকরা গবেষণা ছেড়ে অশুভ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছেন। তাছাড়া গবেষণার টাকা অনেক সময় ব্যক্তিগত কাজেও ব্যবহার করেন। পরে গবেষণাকার্য পরিচালনা করতে পারেন না বলে প্রতিবেদনও জমা দেন না।

এদিকে গবেষণায় যে বরাদ্দ দেওয়া হয় তা খুবই অপ্রতুল বলে অভিযোগ শিক্ষকদের। তবে কয়েক বছরের বরাদ্দচিত্রে দেখা যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ছে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের গত চার বছরের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায় শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ হারে রাবির গবেষণা বাজেট বৃদ্ধি পেয়েছে। রাবির গবেষণা বরাদ্দ ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের গবেষণা বরাদ্দ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সর্বশেষ ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৬৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগের ২০২০-২০২১ অর্থবছর বরাদ্দ দেওয়া হয় ৪ কোটি ৯১ লাখ ১০ হাজার টাকা। এর আগে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৪ কোটি ৩১ লাখ ১০ হাজার টাকা। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৪ কোটি ৫ লাখ টাকা। জানতে চাইলে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসি প্রফেসর ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান প্রশাসনের শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন করাই মূল লক্ষ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মূল্যায়ন কমিটিকে সক্রিয় করা হবে। পরে যেন নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প জমা দেন শিক্ষকরা, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে। কেননা গবেষণার ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ভর করে।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here