সনদ থাকলেও নেই পেশাগত স্বীকৃতি

0
17

দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদ থেকে পাশ করা সনদ থাকলেও নেই পেশাগত স্বীকৃতি। ফলে চার বছর মেয়াদি বিএসসি ইন হেলথ/মেডিকেল টেকনোলজি (ডেন্টাল) কোর্সে উত্তীর্ণ দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী প্রাইভেট প্র্যাকটিস বা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না। ভুক্তভোগীরা যুগান্তরকে বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিচালিত এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে তারা পাশ করেছেন। কর্মের সুযোগ না থাকায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দন্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানে ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করছেন। তবে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) তফসিলে কোর্সটি অন্তর্ভুক্ত নয়। সরকারি চাকরিতে ডেন্টাল পেশায় কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। ফলে যোগ্যতা থাকলেও পেশা চর্চার সুযোগ না পেয়ে হতাশ হয়ে পরছেন।

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২০১১-১২ সেশনে সরকারিভাবে কোর্সটি অনুমোদন দেয়। ওই সময় বিএমডিসির অধিভুক্তি ও শর্তগুলো প্রতিপালনের নির্দেশনা দেয়। তবে বিএমডিসি শুরু থেকেই স্বীকৃতি দিতে খামখেয়ালি করছে। সমস্যা সমাধানে ভুক্তভোগীরা ২০১২ সালে আন্দোলন শুরু করলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি ২০১৩ সালের ৩০ জানুয়ারি বিএমডিসি এবং ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর চিঠি দেয়। চিঠিতে কোর্সটিকে বিএমডিসি কর্তৃক অনুমোদন দিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিস রেজিস্ট্রেশন প্রদানের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কোর্স টাইটেল পরিবর্তন করে ‘ব্যাচেলর অব ডেন্টিস্ট্রি অথবা বিএসসি ইন ডেন্টিস্ট্রি করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়।

কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো সুপারিশগুলো একটি গোষ্ঠীর চাপে ব্যাখ্যাহীনভাবে প্রত্যাহার করে নেয়। এমন পরিস্থিতিতে বিএসসি ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন মামলা দায়ের করে। মামলার রায়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক সুপারিশ প্রত্যাহারকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি উচ্চ আদালত সুপারিশ দুটিকে বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রপক্ষ ও বিএমডিসিকে নির্দেশ প্রদান করে। এরপরও তাদের স্বীকৃতি মেলেনি।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এনায়েত হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বিএসসি ডেন্টাল ডিগ্রিধারীদের প্র্যাকটিস রেজিস্ট্রেশন প্রদানের বিষয়গুলো বিএমডিসির সিস্টেমের মধ্যে পড়ে। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের করণীয় কম। তবে বিষয়টি বেশ দীর্ঘ দিন আগের হওয়ায় তিনি এ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত নন। বরং অধিদপ্তরের ডেন্টাল শাখার পরিচালক ভালো বলতে পারবেন।

চিকিৎসা শিক্ষা অধিদপ্তরের ডেন্টাল শাখার পরিচালক ডা. মোশাররফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদ থেকে পাশ করা ডেন্টাল ডিগ্রিধারীদের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের অনুমোন দেওয়া বিএমডিসির আইনগত বিষয়। পূর্বে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে তাদের প্র্যাকটিসের সুপারিশ করা হলেও পরে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে শুনেছেন। তখন তিনি দায়িত্বে ছিলেন না। তবে তারা চিকিৎসকদের সহযোগী হিসাবে কাজ করতে পারবেন। তাছাড়া একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকার নিয়ম। এ লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। তিনি মনে করেন, এসব গ্র্যাজুয়েটদের সরকারি পদ সৃষ্টির মাধ্যমে কাজে লাগানো উচিত। এতে করে সেবার পরিধি বাড়বে।

জানতে চাইলে বিএমডিসির সভাপতি ডা. মাহমুদ হাসান কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করে রেজিস্ট্রারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। পরে বিএমডিসির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ডা. আরামান হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বিদ্যমান আইনে বিএসসি ডেন্টাল ডিগ্রিধারীদের রেজিস্ট্রেশন প্রদানের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। তাহলে এসব ডিগ্রিধারীরা পেশাগত কী করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্বতন্ত্র একটি মেডিকেল অ্যান্ড অ্যালাইড কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে তাদের আওতায় আনার বিষয়ে চিন্তা করা যেতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা যুগান্তরকে আরও বলছেন, চার বছর মেয়াদি ডেন্টাল কোর্সটির তিন বছর অ্যাকাডেমিক এবং এক বছর ইন কোর্স ট্রেনিং (ইন্টার্নি) মাধ্যমে শেষ হয়। ইন কোর্স ট্রেনিং সরকারি ডেন্টাল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে অথবা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেন্টাল ইউনিটের বিভাগসমূহে করতে হয়। বিএসসি-ডেন্টাল কোর্স কারিকুলাম ক্লিনিক্যাল ও সম্পূর্ণ প্র্যাকটিসনির্ভর। এমনকি এই কোর্সের একজন শিক্ষার্থীকে দন্ত চিকিৎসা বিষয়ক হিউম্যান অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, মাইক্রোবায়োলজি, প্যাথলজি, ওরাল অ্যান্ড ডেন্টাল অ্যানাটমি, অর্থডোন্টিক্স, ডেন্টাল প্রস্থেটিক্স, ওরাল প্যাথলজি অ্যান্ড ওরাল মেডিসিন, কেমিস্ট্রি অব ডেন্টাল ম্যাটারিয়ালস, চিলড্রেন অ্যান্ড প্রিভেনটিভ ডেন্টিস্ট্রি, ডেন্টাল সার্জারি অ্যাসিস্টেন্স অ্যান্ড এনেসথেটিকস, জেনারেল অ্যান্ড ডেন্টাল ফার্মাকোলজি, কনজারভেটিভ ডেন্টিস্ট্রি এবং ডেন্টাল রেডিওলজি প্রভৃতি ক্লিনিক্যাল বিষয়ে (১৯৭০ ঘণ্টা তত্ত্বীয় ও ১২১০ ঘণ্টা ব্যবহারিক) পড়তে হয়। বিডিএস (ব্যাচেলার অব ডেন্টাল সার্জারি) কোর্সেও বিষয়গুলো পড়ানো হয়। শিক্ষার্থীদের ক্লাস, পরীক্ষা ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণও দেন এমবিবিএস ও বিডিএস চিকিৎসকরা। তারপরও কোর্স টাইটেলের সঙ্গে অযাচিতভাবে টেকনোলজি শব্দটি জুড়ে দেওয়ায় সনদধারীদের প্র্যাকটিসের অনুমোদন দেওয়া হয়না।

বিএসসি-ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব উত্তম কুমার যুগান্তরকে বলেন, বিএমডিসি আইনের সব নিয়মনীতি অনুসরণ করে একধিকবার আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কাউন্সিলের কাছে বারবার আবেদন করলেও বিষয়টি আমলে নেয়নি। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির বিধি মোতাবেক মানদণ্ড যাচাইয়ের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সবশেষ আবেদনের প্রেক্ষিতে মূল বিষয়বস্তুকে পাশ কাটিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে। আবেদনে বিএসসি ডেন্টাল কোর্সটিকে তফসিলভুক্ত করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তারা বিএসসি ডেন্টাল কোর্স টাইটেলে সংযুক্ত টেকনোলজি শব্দটিকে অপব্যাখা করে। ক্লিনিক্যাল কারিকুলামকে টেকনোলজিস্টের তকমা লাগিয়ে নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে যায়। অথচ রাষ্ট্র শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা চার বছর মেয়াদি পেশাগত ডেন্টাল ডিগ্রি অর্জন করেছে। এরপরও বিএমডিসি কর্তৃপক্ষ ডিগ্রিকে নিবন্ধন না দিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের বঞ্চিত করছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here