পুড়ল দেড়শ কোটি টাকার রপ্তানি পোশাক

0
17

সীতাকুণ্ডে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত বিএম ডিপোতে ৪৪ প্রতিষ্ঠানের প্রায় দেড়শ কোটি টাকার তৈরি পোশাক তথা রপ্তানি পণ্য ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নামিদামি ব্র্যান্ডের কাপড়ও ছিল সেখানে।

সব আগুনে পুড়ে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) মঙ্গলবার পর্যন্ত এই বিপুল পরিমাণ পণ্য থাকার তথ্য পেয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) জানিয়েছে, এ ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

বিজিএমইএ বলছে, বিএম ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে তৈরি পোশাক শিল্পেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। আর্থিক ক্ষতি ছাড়াও এ ঘটনায় দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় খাতটি ইমেজ সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিজিএমইএ।

তারা বলছে, তৈরি পোশাক শিল্প ও এই শিল্পের উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্স নিয়ে অতীতে ওঠা প্রশ্ন নতুন করে তুলতে পারে ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতা দেশগুলো। সেক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে, যা পুড়ে যাওয়া পোশাকের আর্থিক ক্ষতির চেয়ে অনেক বেশি। প্রাথমিকভাবে বিস্ফোরণে এ শিল্পের প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

কোনো প্রতিষ্ঠানের কী পরিমাণ পোশাক নষ্ট হয়েছে, তার একটি তালিকা তৈরি করছে বিজিএমইএ। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ডিপোতে ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের পোশাক ছিল। এই তালিকা আরও অনেক দীর্ঘ হবে। কারণ প্রতিদিনই রপ্তানিকারকরা তাদের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ জানাচ্ছেন বিজিএমইএকে। এর মধ্যে কোনো কোনো রপ্তানিকারকের ১০-১২ কোটি টাকার পোশাকও ছিল। ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চট্টগ্রামের রয়েছে ১০টি। বাকিগুলো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার।

বিএম ডিপোয় থাকা বেশিরভাগ রপ্তানি চালানই যাওয়ার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। এছাড়া যুক্তরাজ্য, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশেও রপ্তানির কথা ছিল। সবচেয়ে বেশি চালান ছিলে বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘এইচঅ্যান্ডএম’এর। ‘এইচঅ্যান্ডএম’ বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় একটি ব্র্যান্ড।

বিজিএমইএ সূত্র জানায়, বিএম ডিপোতে যেসব পোশাক কারখানার রপ্তানিমুখী পণ্য ছিল তার মধ্যে রয়েছে-শিন শিন অ্যাপারেলস, কেএ ডিজাইন, জেএফকে ফ্যাশন, একেএইচ নিটিং অ্যান্ড ডায়িং, ভার্সেটাইল টেক্সটাইলস, রিও ফ্যাশন ওয়্যার, ভিশন অ্যাপারেলস, ইমপ্রেস-নিউটেক্স কম্পোজিট টেক্সটাইলস, আমান টেক্স, আয়েশা ক্লথিং কোম্পানি, আসওয়াদ কম্পোজিট মিলস, আরকেই নিট ডায়িং মিলস, টিআরজেড গার্মেন্টস, রেমি হোল্ডিংস, তারাসিমা অ্যাপারেলস, কেসি বটম অ্যান্ড শার্ট ওয়্যার, ভ্যানগার্ড গার্মেন্টস, মাসিহাতা সোয়েটার, মোশারফ অ্যাপারেলস স্টুডিও, চৈতি কম্পোজিট লি, স্টারলিং ডেনিমস, নিউএজ অ্যাপারেলস, কেইলক নিউএজ বাংলাদেশ, আরাবি ফ্যাশন, দিগন্ত সোয়েটারস, হপ ইনক বাংলাদেশ, তাকওয়া ফেব্রিকস, ফাউন্টেইন গার্মেন্টস,ম্যাগপাই কম্পোজিট, স্মি অ্যাপারেলস, পিমকি অ্যাপারেলস, ভিনটেজ ডেনিম অ্যাপারেলস, সিব্ল–অ্যান্ডসি টেক্স টেক্সটাইলস, অ্যারো ফেব্রিকস,ক্লিফটন টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলস, ভেনচুরা বাংলাদেশ, ক্লিফটন কটন মিলস, সুজি ফ্যাশনস, ইবালন ফ্যাশনস, সেনটেক্স অ্যাপারেলস, ডিভাইন ইনটিমেটস, ডিভাইন ডিজাইন, বিলামি টেক্সটাইলস, পেসিফিক জিন্স।

তৈরি পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজার মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর এ শিল্পে বড় ধরনের ধাক্কা আসে। অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের কমপ্লায়েন্স বিষয়ক নানা শর্তে একের পর এক বন্ধ হতে থাকে গার্মেন্টস কারখানা। তবে অনেক কারখানা শতভাগ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করে শেষ পর্যন্ত সেই কঠিন পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হয়। সেফটি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে আস্থা ফিরে আসে বিদেশি ক্রেতাদের। এরপর আসে করোনার ধাক্কা। বৈশ্বিক এ মহামারির কারণে কমে যায় তৈরি পোশাক রপ্তানি।

সেই অবস্থা থেকেও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে শিল্পটি। এরইমধ্যে শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তার ঢেউ এসে লাগে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পেও। বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্য কমে যায়। কোভিড ও যুদ্ধের প্রভাব অনেকটা কাটিয়ে উঠে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল খাতটি। এমন পরিস্থিতিতে ঘটল বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ, যাতে গার্মেন্টস শিল্পের ক্ষতিই হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

বিকডার তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় প্রায় ৮০০ কোটি টাকা রপ্তানি খাতের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমদানি খাতের ক্ষতি ৪০০ কোটি টাকা। বাকি ক্ষতি খালি কনটেইনার ও ডিপোর অবকাঠামোগত। বিকডার হিসাব মতে, ডিপোটিতে মোট ৪ হাজার ৩০০ কনটেইনার ছিল। এর মধ্যে রপ্তানিমুখী ৮০০ ও আমদানিমুখী ৫০০। খালি কনটেইনার ছিল ৩ হাজার। প্রায় ৮৫ ভাগ কনটেইনারই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুর্ঘটনায়।

বিজিএমইএ’র প্রথম সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বিএম ডিপো’র ঘটনায় আমাদের যে শুধু আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা নয়। ইমেজও নষ্ট হয়েছে। বহির্বিশ্বে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন্ন হয়েছে। এ ঘটনা বিদেশি ক্রেতাদের এমন বার্তা দিতে পারে যে, বন্দর ও এর সঙ্গে সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর সেফটি ও নিরাপত্তা সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। এটা অশনিসংকেত। এর প্রভাব হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি। করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরও তৈরি পোশাক শিল্প ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। এ অবস্থায় সীতাকুণ্ডের ঘটনাটি একটি বড় আঘাত। এখনো ক্ষয়ক্ষতির পুরো চিত্র পাইনি। প্রতিদিনই গার্মেন্টস মালিকরা তাদের ক্ষতির তথ্য পাঠাচ্ছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here