সংযত ও দরিদ্রবান্ধব বাজেট জরুরি

0
29

আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটটি বিশেষ পরিস্থিতিতে হচ্ছে। তাই এবার অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় আলাদা এবং ব্যতিক্রমী চিন্তা করতে হবে। গতানুগতিকতার বাইরে অবশ্যই বের হতে হবে। সেই সঙ্গে বাজেট প্রণয়নে বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হামিদ-উজ-জামান।

যুগান্তর : আগামী বাজেট কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ড. জাহিদ হোসেন : করোনা মহামারির ধাক্কা থেকে পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। পাশাপাশি চলমান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। দেশে রাজস্ব আদায় কম। সেই সঙ্গে বিভিন্ন খাতে আছে ভর্তুকির চাপ। ডলার সংকট চলছে। এ রকম নানা প্রেক্ষাপটে এবারের বাজেটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যুগান্তর : আসন্ন বাজেটের চ্যালেঞ্জগুলো কী?

ড. জাহিদ হোসেন : এবার যে চ্যালেঞ্জগুলো দেখা যাচ্ছে, সেগুলো চলতি অর্থবছর বা এর আগের বাজেটগুলোয় ছিল না। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। এটি আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা আছে। এছাড়া বহির্বাণিজ্যের ঘাটতি রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার অভাব, মুদ্রাবাজারে ডলারের দাম বাড়ছে-এ দুটি একই সূত্রে গাঁথা। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য কিনতে ডলারে মূল্য দিতে হয়। সেই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়েছে। করোনার পর মানুষের মুভমেন্ট (চলাফেরা) বেড়েছে। করোনার প্রকোপ কমে যাওয়ায় মানুষের ভীতিও কমেছে। ফলে মানুষ ব্যাপক কেনাকাটা করছে। এই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোটা অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

যুগান্তর : বাজেটে কী ধরনের উদ্যোগ থাকা দরকার?

ড. জাহিদ হোসেন : আন্তর্জাতিক বাজারে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো এই বাজেট দিয়ে তো সমাধান কিছু করা যাবে না। তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদার চাপ কমিয়ে আনার উদ্যোগ থাকতে হবে আগামী অর্থবছরের বাজেটে। বর্তমানে প্রকৃত ভোগব্যয় বেড়েছে। সেই উত্তাপ কমিয়ে আনতে বাজেটে যেসব করণীয় আছে, সেগুলো করতে হবে। দেশে মূল্যস্ফীতি হচ্ছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির তুলনায় এটি খুব বেশি নয়, মাঝামাঝি অবস্থায় বলা যায়। এখনো ডাবল ডিজিটে (দুই অঙ্কে) যায়নি। বিশ্বের অনেক বড় বড় দেশ যেগুলোয় সর্বনিু মূল্যস্ফীতি সব সময়ই কম থাকে, সেগুলোয় এখন অনেক বেশি। কিন্তু প্রশ্ন হলো-বাংলাদেশে এখনো তুলনামূলক মূল্যস্ফীতি কম হওয়ার কারণ কী? এখানে দেখা যাচ্ছে, যেসব পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পেলে ছোঁয়াচে হয়ে যায়; যেমন: গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার প্রভৃতি পণ্যের দাম বাড়লে অন্য অনেক পণ্যের দামই বেড়ে যায়। এসব পণ্যের দাম নির্ধারণ করে সরকার। সম্প্রতি এসব পণ্যের দাম অ্যাডজাস্টমেন্ট (বাড়ানো) হয়নি। ফলে ভর্তুকি বেড়েছে। এ কারণেই দেশে মূল্যস্ফীতি এখনো কম আছে। তবে বহির্বিশ্বের মূল্যবৃদ্ধির চাপ যাতে দেশের মূল্যস্ফীতিতে না পড়ে, সেজন্য কতটা ভর্তুকি দেবে বা দাম বাড়াবে সরকার, সেটি আগামী বাজেটে নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়া বাজেট ঘাটতি সংযত রাখতে হবে। সুদ না ধরে যে ঘাটতি, সেটি যাতে বৃদ্ধি না পায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

যুগান্তর : বাজেট ঘাটতি পূরণে কী করা যেতে পারে?

ড. জাহিদ হোসেন : বাজেট ঘাটতি পূরণে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর সুযোগ কম। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ট্যাক্স হলিডে বাড়ানো হতে পারে। ফলে রাজস্ব আরও কমবে। কিন্তু সরকার করনেট (করের আওতা বিস্তৃত করা) বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কথা বলছে। এক্ষেত্রে কতটা সফল হবে, সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ। তাই বলা যায়, রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে হয়তো বাজেট ঘাটতি পূরণ হবে না। সেক্ষেত্রে ব্যয় কমাতে হবে। ইতোমধ্যেই সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। যেমন: সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর স্থগিত করা। যেসব প্রকল্পে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার রয়েছে, সেগুলো ধীরে বাস্তবায়ন করা। এসব উদ্যোগ ভালো। ডলারের ব্যবহার কমাতে এসব উদ্যাগ কার্যকর হবে। ভর্তুকির চাপ কমানোর ক্ষেত্রে সারের দাম বাড়ালে ঝুঁকিপূর্ণ হবে। সেখানে ইউরিয়ার দাম না বাড়িয়ে ভর্তুকি (কৃষি) বাড়াতে হবে। কিন্তু বিদ্যুৎ-জ্বালানির ক্ষেত্রে উভয় সংকট আছে। দাম না বাড়ালে ভর্তুকি বাড়বে। আবার দাম বাড়ালে কোভিডের মতো ছোঁয়াচে প্রভাব পড়বে দ্রব্যমূল্যের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ সব পণ্যের দাম বাড়বে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে। তবে ধনী বা উচ্চবিত্তের জন্য ৭/৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতির প্রভাব তেমন পড়বে না। তাদের জন্য এটা সহনীয়। কিন্তু নিু ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য জীবিকার সংকট তৈরি করবে। তখন তারা শুধু খাদ্য জোগাবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমিয়ে দেবে। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন আছে। কিন্তু একবারে না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে আগে থেকে ঘোষণা দিতে হবে। যাতে শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা প্ল্যানিং করতে পারবে। তারা নিজেদের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে।

যুগান্তর : ভর্তুকির ক্ষেত্রে কীভাবে অর্থসাশ্রয় করা যাবে?

ড. জাহিদ হোসেন : ভর্তুকির ক্ষেত্রে তিন জায়গায় সাশ্রয়ের সুযোগ আছে। রপ্তানিতে ১ শতাংশ সাবসিডি বাতিল করা যেতে পারে। কেননা এটির কোনো মানে নেই। এছাড়া রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে আড়াই শতাংশ প্রণোদনার দরকার কী? ডলারের দাম তো সেখানেও বেড়েছে। যারা রেমিট্যান্স পাঠাবে, তারাও তো বেশি দামই পাচ্ছেন। সেই সঙ্গে লক্ষ করলে দেখবেন-ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কটেজ শিল্প সব জায়গায়ই ডাবল ডিজিট প্রবৃদ্ধি হয়েছে। পরপর দুই বছর শিল্প খাতে ডাবল ডিজিট প্রবৃদ্ধির পরও প্রণোদনার দরকার কী? সেখানে সরকার তো ভর্তুকি দিচ্ছে। এটা বাতিল করা যেতে পারে।

যুগান্তর : আগামী বাজেট কেমন হওয়া দরকার?

ড. জাহিদ হোসেন : বাজেটে বাস্তবভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা দরকার। সুপরিকল্পনার অন্যতম বিষয় হলো এটা লক্ষ্য ও কৌশলের মধ্যে মিল রাখতে হয়। যদি লক্ষ্য এমন হয় যে তা পূরণে কোনো কৌশলই নেই, তাহলে সেটির বাস্তবায়ন কীভাবে সম্ভব হবে। বাজেট হতে হবে অর্থনৈতিক। রাজনৈতিক বাজেট দেওয়া ঠিক নয়। কেননা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয় বলেই বছরের পর বছর আমাদের দেশের বাজেট বাস্তবায়ন অযোগ্যই থাকছে। তবে আগামী অর্থবছরের বাজেট হতে হবে সংযত ও দরিদ্রবান্ধব।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. জাহিদ হোসেন: যুগান্তরকেও ধন্যবাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here