করপোরেট কর আবারও কমছে ২.৫ শতাংশ

0
26

আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরেও করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানো হচ্ছে। শুধু পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত কোম্পানিই এ সুবিধা পাবে, অন্য সব খাতের কর হার অপরিবর্তিত থাকবে। যদিও এ সুবিধা পেতে কঠিন শর্ত মানতে হবে। এতে ছাড়ের সুফল কতটুকু পাওয়া যাবে তা নিয়ে সন্দিহান বেসরকারি খাত। এ নিয়ে টানা তিন অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে কর কমানোর পথে হাঁটছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অন্যদিকে একক মালিকানাধীন কোম্পানির (ওপিসি) কর হারও আড়াই শতাংশ কমানো হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের দায়িত্বশীল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরের রাজস্বনীতি প্রণয়নে এনবিআরকে বেগ পোহাতে হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে কাঁচামাল ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখতে অনেক পণ্য আমদানিতে শুল্ক-কর ছাড় দিতে হচ্ছে। এতে রাজস্ব আয় কমে যাবে। তবে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে এনবিআর সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। কারণ বিনিয়োগ বাড়লে অর্থনীতিতে গতি আসবে। তাই বাজেটে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া হচ্ছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় করপোরেট করে ছাড় দেওয়াকে যৌক্তিক মনে করা হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে নতুন শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।

সূত্রগুলো বলছে, শর্তসাপেক্ষে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত কোম্পানি কর হার আড়াই শতাংশ কমিয়ে যথাক্রমে ২০ শতাংশ ও ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশ শেয়ার অফলোড করতে হবে। তা না হলে কর ছাড়ের সুবিধা পাওয়া যাবে না। আর তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির যাবতীয় লেনদেন ব্যাংক অথবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। অন্য সব খাতে করপোরেট কর অপরিবর্তিত থাকছে।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বাজারে অন্যতম সমস্যা হলো সরবরাহ সংকট। এখানে ভালো কোম্পানির সংখ্যা খুব কম। ফলে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কর ছাড় ইতিবাচক। তবে দেখতে হবে ওই সুযোগ নিয়ে কোনো দুর্বল কোম্পানি যাতে বাজারে না আসে।

অবশ্য উদ্যোক্তারা বলছেন, চলমান পরিস্থিতিতে শুধু করপোরেট কর এ ছাড় দিয়ে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো যাবে না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো ও জ্বালানির মূল্যও বিনিয়োগের বড় নিয়ামক। সম্প্রতি গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সে অনুযায়ী দাম বাড়ানো হলে নতুন বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। শুধু তাই নয়, পুরাতন শিল্প টিকিয়ে রাখা যাবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তাই বাজেটে করপোরেট করের পাশাপাশি আপৎকালীন সময়ের গ্যাস-বিদ্যুতে ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান বলেন, করপোরেট কর কমানোর সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু বাংলাদেশের কার্যকরী কর হার অনেক বেশি, যা প্রতিযোগী সক্ষম নয়। আমদানি বা উৎপাদন পর্যায়ে ১২-১৩টি খাতে অগ্রিম ট্যাক্স-ভ্যাট কেটে নেওয়া হয়। পরে তা রিফান্ড পাওয়া যায় না। রিফান্ড ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারলে বেসরকারি খাত এ সুফল ভোগ করতে পারবে।

তিনি আরও বলেন, এক ব্যক্তির মালিকানাধীন কোম্পানিকে এনবিআর কর ছাড় দিচ্ছে, নিঃসন্দেহে এটাও ভালো উদ্যোগ। কিন্তু গোড়াতেই গলদ আছে। আইনে কোম্পানি গঠনে যে পরিমাণ মূলধনের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে তাতে অনেক ছোট উদ্যোক্তা কোম্পানি গঠনে আগ্রহ হারাচ্ছে। তাই সুযোগ দিয়েও ছোট উদ্যোক্তাদের ফরমাল অর্থনীতিতে আনা যাচ্ছে না।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের নির্বাহী চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ বলেন, কর কমানোর উদ্যোগতে স্বাগত জানাই। তবে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটিই একমাত্র নিয়ামক নয়। যেমন বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ আছে, বাংলাদেশের কর পলিসি স্থিতিশীল নয়। ঘন ঘন পরিবর্তন হয়। এর সঙ্গে কর দেওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু জটিলতা আছে। আইনে কর কর্মকর্তাদের অনেক ক্ষমতা দেওয়া আছে। তারা চাইলে কোনো ব্যয়কে গ্রহণ না করে করারোপ করতে পারেন। এ ধরনের খুঁটিনাটি আরও কিছু বিষয় আছে, যেগুলো সমাধান করলে করপোরেট কর ছাড়ের সুবিধা পাওয়া সম্ভব। এটা কমালেই বিনিয়োগ কর পলিসিতে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নানা অভিযোগ আসে। এজন ঘনঘন পরিবর্তন না করে দীর্ঘমেয়াদি কর পলিসি দিতে হবে। কর দিতে গেলে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। অটোমেশন করতে পারলে বিদ্যমান কাঠামো অনুযায়ী, পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ব্যাংকের কর হার ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ ও তালিকাবহির্ভূত ব্যাংকের কর হার ৪০ শতাংশ। মার্চেন্ট ব্যাংকের কর ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। সিগারেট, বিড়ি, জর্দা ও তামাক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর ৪৫ শতাংশ। মোবাইল অপারেট কোম্পানির কর তালিকাভুক্ত হলে ৪০ শতাংশ এবং তালিকাবহির্ভূত হলে ৪৫ শতাংশ কর দিতে হয়। সমবায় প্রতিষ্ঠান (কো-অপারেটিভ সোসাইটি) এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের কর ১২ শতাংশ। এর বাইরে তৈরি পোশাক খাতের সবুজ প্রতিষ্ঠানকে ১০ শতাংশ ও সাধারণ প্রতিষ্ঠানের কর ১২ শতাংশ। টেক্সটাইল শিল্পের করপোরেট কর ১৫ শতাংশ।

অন্যদিকে আগামী অর্থবছরের বাজেটে এক ব্যক্তির মালিকানাধীন কোম্পানির (ওপিসি) করপোরেট করে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। আগে কোম্পানি আইনের অধীন গঠিত পুঁজিবাজারের তালিকাবহির্ভূত কোম্পানিকে সাড়ে ৩২ শতাংশ করপোরেট কর দিতে হয়। চলতি অর্থবছরে সেটি কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে সেটি আরও আড়াই শতাংশ কমিয়ে ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হচ্ছে। মূলত ছোট উদ্যোক্তাদের মূলধারার অর্থনীতিতে আনতে বাজেটে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here