অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় গুরুত্ব আ.লীগের

0
20

বিএনপিকে এনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করার সম্ভাব্য উপায় খুঁজছে সরকার। এক্ষেত্রে দলটির (বিএনপি) সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপের পরিবর্তে ‘আলোচনা’কে প্রাথমিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এমন উদ্যোগ সবচেয়ে কার্যকর ও সম্মানজনক হতে পারে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা।

আলোচনা কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকরা চিন্তাভাবনা করছেন। নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন এবং নির্বাচন কমিশন গঠনে অতীতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক সংলাপ সফল না হওয়ায় অনানুষ্ঠানিক আলোচনাকে প্রাথমিকভাবে অগ্রাধিকারে রেখেছেন তারা। আর প্রাথমিক আলোচনা ফলপ্রসূ হলে সবকিছুর চূড়ান্ত রূপ দিতে প্রয়োজনে আনুষ্ঠানিকতায় যাবে ক্ষমতাসীনরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের নীতিনির্ধারকরা যুগান্তরকে বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হতে পারে প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক অথবা অনানুষ্ঠানিক। দরকষাকষির মাধ্যমে সেখানেই নির্ধারিত হতে পারে বিদেশে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়টিও।

গত নির্বাচনের আগে প্যারোলে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে তার আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে গোপন আলোচনার সূত্রপাত করেছিল সরকার। বিএনপি নেতারা তখন প্যারোলে মুক্তির সম্ভাবনার সংবাদ উড়িয়ে দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়াতেই মুক্তি পান খালেদা জিয়া। তাই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে অনড় থাকলেও বিএনপির সঙ্গে আলোচনা শুরু করার পক্ষে সরকার। এই আলোচনা যে কোনো সময় শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন নীতিনির্ধারকরা।

সর্বশেষ ৭ মে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে বিএনপির অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করেন দলটির সিনিয়র নেতারা।

এ ব্যাপারে সভায় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করতে দেখা গেছে বলে জানান উপস্থিত দলটির নেতারা। সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে প্রধানমন্ত্রীও আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ওই সভায় বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে সরকারকেই উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতা।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপির অধিকার। আমরা চাই তারা নির্বাচনে আসুক। তাদের সঙ্গে আলোচনার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না-জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক যুগান্তরকে বলেন, নিজেদের স্বার্থেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ করা উচিত। তা না হলে দলটির যে ক্ষতি হবে, তা কাটিয়ে ওঠা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা চাই, বিএনপি নির্বাচনে এসে তাদের জনপ্রিয়তা যাচাই করুক। নির্বাচনের স্বার্থে অতীতে আমাদের সরকার ও নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে যদি কোনো আলোচনার প্রয়োজন হয়, তা করতে আমাদের দ্বিধা নেই।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের জন্য যা ভালো হবে, তাই করবেন। গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারেও নিশ্চয় তিনি পদক্ষেপ নেবেন।

নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গত বছর ডিসেম্বরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেন। কিন্তু বিএনপি, কমিউনিস্ট পার্টিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল সংলাপে যায়নি। এবার ভরসা করেননি তারা। যদিও নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে ২০১২ সালে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান এবং ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের আয়োজনে এমন সংলাপ হয়েছিল।

এ দুটি বৈঠকে আমন্ত্রিত সব রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসেনি। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ‘সংলাপ’ হয়। যার মাধ্যমেও একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করা যায়নি।

এ কারণে সরকার আর এই ধরনের সংলাপের ব্যাপারে তেমন আগ্রহী নয়-এমনটাই জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য। তিনি যুগান্তরকে জানান, এবার দুই পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্যে অথবা গোপনে আলোচনা ও সমঝোতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

১৯৯৪ সালে কমনওয়েলথ সেক্রেটারি জেনারেলের প্রতিনিধি হিসাবে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর জেনারেল স্যার নিনিয়ান স্টিফেনের সহায়তায় আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে দীর্ঘ সংলাপ হয়। ওই সংলাপ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। তেমনই ব্যর্থ হয় জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতিনিধি অস্কার তারানকোর মধ্যস্থতায় সংলাপ।

২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়ার অসম্মতির কারণে আনুষ্ঠানিক সেই দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়নি। এর আগে ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের সঙ্গে বিএনপি মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। বেশ কয়েকদিন ধরে জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত জলিল-মান্নান ভূঁইয়ার সেই সংলাপও সফল হয়নি।

এ অবস্থায় সরকার গোপন আলোচনায় বিএনপির সঙ্গে একটা সমঝোতায় যাওয়ার ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী। সেই সঙ্গে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে আনতে কূটনৈতিক উপায়ে চাপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

এই কৌশলের অংশ হিসাবে এপ্রিলে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্টনি ব্লিংকেনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের বৈঠকে আগামী নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। বিএনপি যাতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়, সে ব্যাপারে চাওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here