সুইফট নিষেধাজ্ঞায় অর্থ পরিশোধে জটিলতা

0
20

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অর্থ পরিশোধে জটিলতা দেখা দিয়েছে। এ প্রকল্পের রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘জেএসসি এটমস্টয়এক্সপোর্ট’-এর নির্ধারিত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ‘ভিইবিআরএফ’-এর মাধ্যমে লেনদেন করতে পারছে না। ফলে নির্মাণ চুক্তির অগ্রিম অর্থ চাইলেও বাংলাদেশ ওই প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করতে পারছে না।

রাশিয়ার কিছু ব্যাংককে সুইফট (সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টার ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন) বাদ দেওয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তবে অর্থ পেতে বিকল্প পথে বাংলাদেশের ভেতর এফসি (বৈদেশিক মুদ্রায়) অ্যাকাউন্ট খুলে লেনদেনের প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। দেশের অভ্যন্তরণে এ ধরনের বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অ্যাকাউন্ট খোলার আইনি বিধান আছে কিনা খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংককে অনুরোধ জানিয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

সোনালী ব্যাংকের সূত্র জানায়, রাশিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রাপ্য অর্থ নেওয়ার জন্য দেশের অভ্যন্তরণে সোনালী ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রা (এফসি) অ্যাকাউন্ট খুলতে চায়। কিন্তু এফসি অ্যাকাউন্ট সাধারণত বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আনার জন্য খোলা হয়। এ ছাড়া এ ধরনের হিসাব খোলার পর তাদের অ্যাকাউন্টে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বৈদেশিক মুদ্রা জমা হবে। অঙ্কের হিসাবে এর ব্যাপ্তি অনেক বেশি। সুইফট ব্যবহার না করে দেশের অভ্যন্তরে এ বিশাল অঙ্কের মার্কিন ডলারের ব্যবস্থা করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে সোনালী ব্যাংকের। পাশাপাশি এফসি অ্যাকাউন্টে মার্কিন ডলার জমা হওয়ার পর এ মুদ্রা রাশিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোথায় কিভাবে ব্যবহার করবে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জানা গেছে, অর্থ পরিশোধের বিকল্প পথ খুঁজতে সম্প্রতি একটি বৈঠক করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জিয়াউল হাসান। সেখানে তিনি বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি সরকারের ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এর বাস্তবায়নে রাশিয়ান পক্ষকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা রয়েছে। সুতরাং বিদ্যমান বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বার্থে রাশিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘জেএসসি এটমস্টয়এক্সপোর্ট’কে সহযোগিতা করা প্রয়োজন।

এদিকে বাংলাদেশের কাছে নির্মাণ চুক্তির প্রাপ্য অর্থ পেতে সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংক হিসাব খুলতে না পারায় রাশিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বলে ওই বৈঠকে তুলে ধরেন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. শৌকত আকবর। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি বলেছেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা থাকবে। তবে অপারেশন কর্তৃপক্ষ হিসাবে সোনালী ব্যাংককে ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যাংক একাধিক বৈঠক করে রাশিয়ান ঠিকাদারের ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করতে পারে। বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, ঢাকাস্থ রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত, সোনালী ব্যাংকের এমডি ও প্রকল্প পরিচালকের সমন্বয়ে উচ্চ পর্যায়ে সভা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, বিকল্প পথ খুঁজতে বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরে এফসি (বৈদেশিক মুদ্রায় হিসা) খুলতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে সোনালী ব্যাংক। আর এফসি ব্যাংক হিসাব খোলা, অপারেশন এবং বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও অন্যান্য সহায়তা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। জানা গেছে, বাংলাদেশ একক প্রকল্প হিসাবে সবচেয়ে বড় অবকাঠামা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। এর ৯০ শতাংশ অর্থেরই জোগান দিচ্ছে রাশিয়া ঋণ সহায়তা হিসাবে। এখন ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমিতে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত ভিবি ব্যাংকসহ দেশটির কিছু ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে।

সূত্র আরও জানায়, রাশিয়ান ঠিকাদার যে টাকা পাবে তা হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চুক্তির অগ্রিম ১০ শতাংশ অর্থ। বাংলাদেশ সরকার এবং রুশ ফেডারেশনের মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ঋণ চুক্তি এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য রাশিয়ান ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘জেএসসি এটমস্টয়এক্সপোর্ট’ ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের মধ্যে স্বাক্ষরিত জেনারেল কন্ট্রাক (নির্মাণ চুক্তি) আলোকে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। ঋণ চুক্তি ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শর্ত অনুযায়ী নির্মাণ চুক্তিমূল্যের ১০ শতাংশ অগ্রিম মূল্য বছরে চার কিস্তিতে পরিশোধ করা হচ্ছে। স্বাক্ষরিত জেনারেল কন্ট্রাকের ধারা ৪৬ অনুযায়ী বাংলাদেশের পক্ষে সোনালী ব্যাংক এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ব্যাংক স্টেট ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন ‘ভিইবিআরএফ’ নির্ধারিত করা হয়। এই দুটি ব্যাংকের মধ্যে আন্তঃব্যাংক সমঝোতা চুক্তির আওতায় চুক্তিমূল্যের ১০ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধের কার্যক্রম চলমান আছে। কিন্তু নতুন করে সমস্যা সৃষ্টি হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। কারণ পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে ‘একঘরে’ করার জন্য আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা সুইফট (সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টার ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন) থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনে বাধা সৃষ্টি হয়।

সূত্র মতে, সুইফটের ওপর নিষেধাজ্ঞার পর বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে লেনদেন কার্যক্রম ‘ভিইবিআরএফ’-এর পরিবর্তে বিকল্প ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেয় রাশিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ জন্য বাংলাদেশ পরমাণু কমিশনকে জেনারেল কন্ট্রাকের অনুচ্ছেদ (সাধারণ চুক্তি) সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে একটি বৈঠক করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক দেশীয় মুদ্রা একটি হিসাব খোলার জন্য সোনালী ব্যাংকে যোগাযোগ করে রাশিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু এ ধরনের হিসাব খুলতে হলে বিভিন্ন অনুচ্ছেদ সংশোধসহ অন্যান্য ডকুমেন্ট প্রয়োজন বলে সোনালী ব্যাংক থেকে জানানো হয়।

যে কারণে আর ব্যাংক হিসাব খুলতে পারছে না রাশিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, অর্থ পরিশোধের বিকল্প পথ খুঁজতে সম্প্রতি আরও একটি বৈঠক করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জিয়াউল হাসান। সেখানে তিনি বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি সরকারের ফাস্ট ট্র্যাক ভুক্ত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এর বাস্তবায়নে রাশিয়ার পক্ষকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা রয়েছে। সুতারং বিদ্যমান বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বার্থে রাশিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘জেএসসি এটমস্টয়এক্সপোর্ট’কে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকার এখনো তা মনে করছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট আগামী বছরের মধ্যে উৎপাদন শুরু করতে পারবে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিটে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here