রিজার্ভ থেকে আয় কমেছে ২১০ কোটি টাকা

0
20

করোনার প্রভাবে গত প্রায় দুই বছর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অর্থ বিনিয়োগ করে আয় আরও কমেছে। গত এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে আয় কমেছে ২১০ কোটি টাকা বা প্রায় ৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার মান কমে যাওয়ার গতি রোধ হওয়ায় এবার পরোক্ষ লোকসান হয়নি। যা আগের বছর হয়েছিল। তবে বিভিন্ন খাতে এবার আয় বেশি হারে কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে এ খাতে আয় হয়েছিল ৫৩৯৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে আয় হয়েছে ৫২৮৫ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আয় কমেছে ২১০ কোটি টাকা বা প্রায় ৪ শতাংশ। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে আয় কম হয়েছিল ১৯৮৩ কোটি টাকা। সে হিসাবে এবার আয় কমার হার হ্রাস পেয়েছে। গত অর্থবছরে করোনার ধকল কম ছিল। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা বাণিজ্যে গতি ফিরতে শুরু করেছে। ফলে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার মান বাড়তে থাকায় বৈদেশিক মুদ্রা থেকে আয় কমার প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অর্থ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ও সরকারি বন্ডে ঝুঁকি বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিনিয়োগ করে। করোনার প্রভাবে গত বছর প্রায় সব দেশের মুদ্রার মান ও বন্ডের সুদের হার কমেছে। এ কারণে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ থেকে আয় কম হয়েছে। তবে লোকসান হয়নি, আয় হয়েছে, কিন্তু আয়ের হার বেশ কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক বন্ডের সুদের হার নেতিবাচক হয়ে গেছে। কোনোটার সুদের হার শূন্যে নেমে গেছে। এসব কারণে এমনটি হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি বড় অংশই বিভিন্ন দেশের সরকারি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়। এ থেকে অর্জিত মুনাফা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যোগ হয়। ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক গতিতেই এগোচ্ছিল। ওই বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনে করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। ২০২০ সালের মার্চ থেকে জুন সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্য ছিল স্থবির। ওই সময় থেকেই বিশ্ববাজারে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার দাম কমতে থাকে। একই সঙ্গে কমতে থাকে বিভিন্ন দেশের সরকারের ছাড়া বন্ডের সুদের হার। মূলত ফেব্রুয়ারি থেকে মুদ্রা ও বন্ড বাজারে পতন শুরু হলে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বিনিয়োগ তুলে নেওয়া শুরু করে। কারণ করোনার প্রকোপ বৃদ্ধিতে সুদের হার ও মুদ্রার দাম কমে যাওয়ায় রিজার্ভের অর্থ বিনিয়োগ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে আগেই সেগুলো বিক্রি করে দেয়। এতে লোকসানের মাত্রা কমানো সম্ভব হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার দাম কমে যাওয়ার কারণে রিজার্ভে পরোক্ষ লোকসান হয়েছিল ২৬৬৪ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এ খাতে কোনো লোকসান হয়নি। মুদ্রার মান বেড়েছে ১০৯৩ কোটি টাকা।

করোনার প্রকোপ কমায় গত অর্থবছরে অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে মুদ্রার মানও বেড়েছে। ফলে আয়ের নেতিবাচক ধারা ও লোকসানের হার কমে এসেছে।

প্রতিবেদনের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রা থেকে আয় হয়েছিল ৪৯৬৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এ খাতে আয় হয়েছে ২৫৭৭ কোটি টাকা। এ সময়ে আয় কমেছে ২২৮৯ কোটি টাকা বা ৪৬ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে সুদ বাবদ আয় হয়েছিল ৪৯৩২ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে হয়েছে ২৫৪৫ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে সুদ বাবদ আয় কমেছে ২৩৮৭ কোটি টাকা বা ৪৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। একই সময়ের ব্যবধানে কমিশন বাবদ আয় ৩৪ কোটি টাকা থেকে কমে ৩২ কোটি ডলারে নেমেছে। আয় কমেছে দুই কোটি টাকা।

সূত্র জানায়, করোনার সময়ে ২০২০ সালের মাঝামাঝিতে ইউরো বন্ডের সুদের হার নেতিবাচক অবস্থায় গিয়েছিল। ডলার বন্ডের সুদের হার দশমিক ৩৫ শতাংশ থেকে কমে দশমিক ১২ শতাংশে নেমে এসেছিল। এ ছাড়া ইউরোর দরপতন হয়েছিল ২৬ শতাংশ, ডলারের ১৮ শতাংশ। অন্যান্য মুদ্রারও দরপতন হয়েছিল। যে কারণে সুদ থেকে আয় কমে গিয়েছিল।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার দাম বাড়ার কারণে ২০১০-২০ অর্থবছরে এ খাতে আয় বেড়েছিল ৪২৭ কোটি টাকা। ২০২১ সালে বেড়েছে ২৬০৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে আলোচ্য সময়ে মুদ্রা বিক্রি করে আয় তিন হাজার ৯১ কোটি টাকা থেকে কমে হয়েছে এক হাজার ৫১৩ কোটি টাকা। এ খাতে আয় কমেছে এক হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা বা ৫১ শতাংশের বেশি।

মুদ্রা বিক্রি করা হয়নি অথচ দাম কমেছে এ কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে লোকসান ছিল দুই হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাতে কোনো লোকসান হয়নি। বরং মুনাফা হয়েছে এক হাজার ৯৩ কোটি টাকা।

সূত্র জানায়, ২০২০ সালে করোনার প্রভাবে যে হারে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন মুদ্রার মান ও বন্ডের সুদের হার কমেছিল গত বছর তা অনেকটা আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। এতে নতুন করে লোকসান হয়নি। ফলে লাভের মুখ দেখেছে।

উল্লেখ্য, গত ৬ এপ্রিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৪৪২৪ কোটি ডলার। গত ৩০ জুন ছিল ৪৬৪০ কোটি ডলার। গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪৩৭০ কোটি ডলার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here