‘সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের কোনো নীতিমালা নেই’

0
32

বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উপাচার্য নিয়োগের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় প্রয়োজনীয় যোগ্যতা এবং দক্ষতাবিহীন অনেকেই উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়ে যাচ্ছেন। আর তাদের কার্যকলাপের কারণেই উপাচার্যদের নিয়ে নানা বিতর্ক এবং প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক দুই উপাচার্য এবং সাবেক ডাকসু নেতা এ মন্তব্য করেছেন। তারা বলেন, উপাচার্যরা সততার সাথে মেরুদণ্ড শক্ত করে দায়িত্ব পালন করলে তাদের নিয়ে কোনো বিতর্কই হতো না।

কানাডার বাংলা পত্রিকা ‘নতুনদেশ’ এর প্রধান সম্পাদক শওগাত আলী সাগরের সঞ্চালনায় সম্প্রচারিত ‘শওগাত আলী সাগর লাইভে’র আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এই মতামত দেন।

‘বাংলাদেশের উপাচার্যদের নিয়ে এত প্রশ্ন কেন’ শীর্ষক এই আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মান্নান, বাংলাদেশ উপাচার্য পরিষদের সাবেক সভাপতি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. জসিমউদ্দিন আহমদ এবং ডাকসুর সাবেক এজিএস নাসির উদ দোজা অংশ নেন। রোববার কানাডার স্থানীয় সময় দুপুরে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, বাংলাদেশের নতুন জেনারেশনের ৫২টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের কোনো নীতিমালা নাই। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের আইন থাকলেও কেবলমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই সেই আইনের আলোকে ভিসি নিয়োগ হয়েছে, আর কোথাও নয়।

অধ্যাপক মানান্ন বলেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগের জন্য যে রিজেন্ট বোর্ড আছে তার সদস্য হচ্ছেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ,তিন চার জন করে আমলা,রাজনৈতিক দলের স্থানীয় সদস্য। রিজেন্ট বোর্ডকে এরাই নিয়ন্ত্রণ করে। এদের কথামতো না চললে ওই জায়গায় কেউ দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। তিনি প্রশ্ন করেন, বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত রিজেন্ট বোর্ডে ৪-৫ জন আমলা কেন থাকবে, তাদের কেন সিন্ডিকেটের সদস্য করতে হবে। দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদদের এই জায়গায় নিয়োগ দিলে তাদের মেধাভিত্তিক পরামর্শে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উপকৃত হতে পারতো।

তিনি বলেন, পেশাগত জীবনে কখনো কোনো হলের হাউজ টিউটরের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নেই- এমন শিক্ষকরা উপাচার্য হয়ে যাচ্ছেন। এটি অতীতে হয়েছে, এখনো হচ্ছে, হয়তো ভবিষ্যতেও হবে। তিনি বলেন, অযোগ্য লোক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগ পেলে তিনি অযোগ্য লোকদেরই বেছে বেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসিয়ে দেন।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার জন্য তহবিল বরাদ্দে কোনো সমস্যা নেই উল্লেখ করে অধ্যাপক মান্নান নিজে চার বছর মঞ্জুরি কমিশনের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার উল্লখ করে বলেন, দুই-একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই গবেষনার জন্য দেয়া বরাদ্দ খরচ করতে পারে নাই। টাকা নিয়ে গবেষনার জন্য আমরা গবেষক খুঁজে পাই নাই।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলাম, উপাচার্য ছিলাম’ এটা বলতেও মাঝে মাঝে খুব লজ্জা হয়। বাইরের চাপে, দলীয় চাপে, ছাত্র সংগঠনলোর চাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের কেউ কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করেন বা করতে বাধ্য হন। কিন্তু তাঁরা যদি মেরুদন্ড সোজা রাখেন তা হলে এই চাপ উপেক্ষা করা সম্ভব।বড় জোর উপাচার্যের পদ চলে যাবে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা তো থাকবে।

মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকাকালে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মের তদন্তের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগসহ তদন্ত রিপোর্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়ার পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পরে বলা হয়েছে এই সব রিপোর্ট হারিয়ে গেছে। দুই আড়াই হাজার পৃষ্ঠার রিপোর্ট কীভাবে হারিয়ে যায় প্রশ্ন তুলে অধ্যাপক মান্নান বলেন সরিষার মধ্যে ভূত থাকলে তো সেই ভূত তাড়ানো যাবে না।

উপাচার্য পরিষদের সাবেক সভাপতি এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. জসিমউদ্দিন আহমেদ তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের আর্থ সামজিক বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের ওপর বিশেষ করে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের উপর নানা ধরনের চাপ থাকে।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য গবেষনা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে নিয়ম শিথিল করে একটি মাত্র গবেষণাপত্রের ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই উপাচার্য হিসেবে এমন ব্যক্তি নিয়োগ পাচ্ছেন যাদের শর্তের একটি গবেষণা সেটিও নেই। বহিঃর্বিশ্বে একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচিতি পায় তার শিক্ষক এবং তাদের গবেষণার মাধ্যমে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের গবেষণার দৈন্যদশার কারণেই আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রথম একশতের তালিকায় স্থান পায় না।

ডাকসুর সাবেক এজিএস নাসির উদ দোজা বলেন, আজকের বাস্তবতায় একটি ছাত্র সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যের উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। উপাচার্য মহোদয় সেই নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসতে চান কিনা, নাকি তারা নিজেরাও সেউ নিয়ন্ত্রণে থাকতে চান- সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তিনি উপাচার্যদের মেরুদণ্ড সোজা করে দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, তা না হলে সত্যিকারের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ‘নতুনদেশ’-এর প্রধান সম্পাদক শওগাত আলী সাগর কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উপচার্য নিয়োগের প্রক্রিয়া তুলে ধরে বলেন, স্বাধীন তৃতীয় একটি সংস্থা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খুঁজে যাচাই-বাছাই করে উপাচার্য পদের প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা করে বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়। বাংলাদেশে এ প্রক্রিয়াটি ভাবা যায় কিনা সেই ব্যাপারে চিন্তা করার আহ্বান জানান তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here