বেঁধে দেওয়া সময়ে অর্থ আদায়ে ব্যর্থ

0
39

বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৩৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির অর্থ আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু অর্থ অর্থআত্মসাৎকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে তা আদায় করা সম্ভব হয়নি। ১২টি জালিয়াতি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান সামান্য ঋণ পরিশোধ করেছে, যা মোট অর্থের ১ শতাংশেরও কম। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হতাশা প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। বিশেষ সফটওয়্যারের আওতায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। সেখানে আরও উল্লেখ করা হয়, ঋণ আদায় করতে না পেরে গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা করছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ওইসব ঋণের সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের প্রভাবশালী গ্রাহক ও সাবেক পরিচালকদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এছাড়া করোনার কারণে ঋণ আদায় কার্যক্রম স্থগিত থাকায় গত দুই বছরে এদের কাছ থেকে ঋণ আদায় করা সম্ভব হয়নি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ১২টি ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে মোট ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ায় এগুলোর বিপরীতে সুদ আরোপ করে তা মূলধনের সঙ্গে যোগ করা হচ্ছে না। তবে গত বছর ওইসব ঋণের বিপরীতে ৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকার সুদ অনারোপিত হিসাবে রাখা হয়েছে। এগুলো স্থগিত সুদ বা ইন্টারেস্ট সাসপেন্স অ্যাকাউন্টে রয়েছে। ঋণ নিয়মিত হলে এগুলো মূল ঋণের সঙ্গে যুক্ত হবে। ২০২০ সালে এ খাতে অনারোপিত সুদ ছিল সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। খেলাপি ঋণের চাপ কমানোর জন্য ব্যাংকগুলো ওইসব ঋণের ২২৮ কোটি টাকা রাইট অব বা অবলোপন (মূল হিসাব থেকে আলাদা) করেছে।

সূত্র জানায়, গত বছর বিশেষ সুবিধায় ঋণ নবায়নের জন্য বিসমিল্লাহ গ্রুপ, অ্যানন টেক্স গ্রুপ ও নূরজাহান গ্রুপ কিছু টাকা জমা দিয়েছে। এর বিপরীতে অ্যানন টেক্স ও নূরজাহান গ্রুপ কিছু ঋণ নবায়ন করেছে। বিসমিল্লাহ গ্রুপ এখনো নবায়ন করতে পারেনি। এর মধ্যে বিসমিল্লাহ গ্রুপ ৫ ব্যাংক থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পুরো টাকাই বিদেশে পাচার করেছে। অ্যানন টেক্স প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা এবং নূরজাহান গ্রুপের প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে এর আগে ধরা পড়েছে।

কেন্দ্রীয ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, করোনার কারণে চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত বিশেষ সুবিধায় ঋণ পরিশোধে ছাড় দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ ওই সময়ে ঋণ পরিশোধ করলে তা গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিশোধ হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। কিন্তু বাড়তি সময়ে কোনো জালিয়াত প্রতিষ্ঠান ঋণ শোধ করেনি।

এবার ব্যাংকগুলোতে বিশেষ সফটওয়্যারের (কোর ব্যাংকিং সলিউশন বা সিবিএস) মাধ্যমে পরিদর্শন হচ্ছে, সরেজমিনে নয়।

ব্যাংকগুলো তাদের সফটওয়্যারের লেনদেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠিয়ে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সেগুলো খতিয়ে দেখছে। এর আওতায় ওইসব তথ্য পেয়েছে।

সম্প্রতি তিনটি সরকারি ও চারটি বেসরকারি ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতির টাকা আদায়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এ বিষয়ে জানতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জবাবে ব্যাংকগুলো জানিয়েছে, করোনার কারণে ঋণ আদায় স্থগিত ছিল। যে কারণে তারা ওইসব গ্রুপ থেকে ঋণ আদায় করতে পারেনি। তবে তিনটি গ্রুপ ঋণ নবায়নের জন্য কিছু অর্থ এককালীন জমা হিসাবে ২২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পরিশোধে এগিয়ে না আসায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। এর বাইরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে হাজার কোটি টাকার বেশি অংকের ১২টি ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে হলমার্ক গ্রুপের ৪ হাজার কোটি টাকা, ক্রিসেন্ট গ্রুপের ৪ হাজার কোটি টাকা, এসএ গ্রুপের সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা, সিটিসেলের ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা, সানমুন গ্রুপের ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা, তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পিকে হালদারের ৫ হাজার কোটি টাকার জালিয়াতি হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here