ব্যাংক খাতে মূল সমস্যা খেলাপি

0
35

চতুর্থ প্রজন্মের এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের নবম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল শনিবার। এ উপলক্ষ্যে ব্যাংকটির বিভিন্ন অর্জন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) গোলাম আউলিয়া। এ সময় তিনি দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সমস্যা এবং সম্ভাবনা নিয়েও আলোকপাত করেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন-হামিদ বিশ্বাস

এক দশকে পা দিয়েছে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক। এত দিনের অর্জন ও আগামীর লক্ষ্য কি?

গোলাম আউলিয়া : একটি স্বপ্ন নিয়ে এনআরবিসি ব্যাংক যাত্রা শুরু করে। নয় বছরের পথচলায় অনেক দূর এগিয়েছে। গত চার বছরে ব্যাংকটি প্রান্তিক মানুষের ব্যাংকে পরিণত হয়েছে। আর্থিক সূচকের পাশাপাশি মানুষের সেবায় সম্পৃক্ত হতে পেরেছি। ২০১৭ সালে আমানত ছিল সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার কোটি টাকা। ঋণ ৪৩০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার কোটি টাকা। এই ব্যাংকে কর্মী সংখ্যা ৬১৭ জন থেকে ১০ গুণ বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার জন। প্রান্তিক মানুষকে সেবা দেওয়া, ঘরে ঘরে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে ব্যাংকটি অনেকটাই সফল। আরও বহুদূর যেতে চাই। হতে চাই নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসার স্থল। গ্রামের উন্নয়নে হতে চাই অবিচ্ছেদ্য অংশ। আগামীতে গ্রামীণ ও প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যোন্নয়নই মূল লক্ষ্য।

ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বলুন।

গোলাম আউলিয়া : করোনা মহামারির মারাত্মক ছোবল এখনো শেষ হয়নি।

তবে সংক্রমণের হার কমে আসায় সার্বিক পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাচ্ছে। গত দুই বছর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটাই স্থবির ছিল। তবে সংকটকালে কিছু কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এনআরবিসি ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এর ফলে ধারাবাহিক সাফল্য এসেছে। ভালো অবস্থানে আছে ব্যাংকের আর্থিক সূচকগুলো। ২০২১ সালের শেষ দিনে ব্যালান্স শিটের আকার দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংকের বর্তমানে আমানত ১২ হাজার ১০৪ কোটি টাকা, ঋণ ১০ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। ব্যাংকের এডি রেশিও ৮৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আশা করছি চূড়ান্ত হিসাবে ভালো মুনাফাও আসবে। বর্তমানে শাখা ও উপশাখা মিলে ব্যাংকের সেবাকেন্দ্র ৭৫০টি। এরমধ্যে পূর্ণাঙ্গ শাখা ৯৩টি। প্রথম ব্যাংক হিসাবে শুরু করা উপশাখাভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের পরিধি বাড়িয়েছে এনআরবিসি। দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলায় উপশাখা খুলেছে এনআরবিসি ব্যাংক। এছাড়া সরকারের রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে এনআরবিসি ব্যাংক বিআরটিএর ফি আদায়ের পাশাপাশি জমি রেজিস্ট্রেশনের ফিও আদায় করছে। বর্তমানে ভূমি রেজিস্ট্রেশন অফিসে উপশাখার ১০৯টি, রেজিস্ট্রেশন অফিসের ফিস কালেকশন বুথ ৩১২টি। আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক (ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন) কার্যক্রমের সাফল্য দেখিয়েছে এনআরবিসি ব্যাংক। ৫৭৬টি এজেন্ট পয়েন্টের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা দিয়ে যাচ্ছে। কার্ডধারীদের সেবায় সারা দেশে রয়েছে ৮০টি এটিএম বুথ ও সিআরএম।

ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন?

গোলাম আউলিয়া : ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আমরা প্রান্তিক অঞ্চলে ঘরে ঘরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে অর্থায়ন করছি। যাতে গ্রামে বসে মানুষ আয় নিশ্চিত করতে পারে। প্রান্তিক জনগণের জন্য বিশেষ ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। ক্ষুদ্র ঋণের প্রসারের লক্ষ্যে প্রান্তিক জনগণকে সর্বনিম্ন সুদে ঋণ দেওয়া। রাজশাহী, রংপুর বিভাগের শতভাগ জেলায় এটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অন্য বিভাগের জেলাগুলোতেও এই বছরের মধ্যে ক্ষুদ্রঋণ ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

সিএসআর কার্যক্রম সম্পর্কে বলুন।

গোলাম আউলিয়া : এনআরবিসি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে দেশের নানা দুর্যোগে মানুষের পাশে থেকে ‘মানবিক ব্যাংক’ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। করোনা মহামারিতে সম্মুখসারিতে থাকা চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের মাঝে এবং প্রায় অর্ধশতাধিক হাসপাতালে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ করেছি। সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যাংকিং সেবার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং কল সেন্টারের (১৬৪১৩) সমন্বয়ে এনআরবিসি হেলথ ডেস্ক গঠন করা হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে নগদ টাকা এবং ত্রাণ সামগ্রী দিয়েছে।

ব্যাংক খাতে কি ধরনের সংস্কার জরুরি?

গোলাম আউলিয়া : ব্যাংক খাতের মূল সমস্যা খেলাপি ঋণ। কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায় ইচ্ছা করেই অনেকে ব্যাংকের টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। ব্যাংকগুলো চেষ্টা করেও অর্থ আদায় করতে সক্ষম হচ্ছে না। খেলাপি ঋণ কমাতে হলে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং প্রয়োগ করতে হবে। বিদ্যমান আইন সংস্কার করতে হবে। যেন ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। বিশ্বের অনেক দেশেই ঋণখেলাপিদের জন্য কঠোর আইন রয়েছে। ব্যাংকের টাকা ফেরত না দিলে তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাদের পাসপোর্ট এবং অ্যাকাউন্ট ব্লক হয়ে যায়, সামাজিকভাবে হেয় করা হয়। আবার পরিস্থিতির কারণে যারা টাকা ফেরত দিতে পারছেন না, তাদের জন্য সঠিক এক্সিট সুবিধা নেই। বিদ্যমান আইন সংস্কার করে এই ধরনের আইন জরুরিভিত্তিতে প্রণয়ন করতে হবে। ব্যাংকের আরেক দিক হলো কমপ্লায়েন্স। কমপ্লায়েন্স না হলে অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ থাকে। এটি বন্ধ করতে হলে ফিনটেকের ব্যবহার বাড়াতে হবে। ব্যাংক একা প্রযুক্তিনির্ভর হলে হবে না। পুরো রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে। এজন্য বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।

নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কিছু বলুন।

গোলাম আউলিয়া : নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের অবস্থা খুবই খারাপ। কয়েকটি ছাড়া বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে গভীর সংকটে পড়েছে। অনেক ব্যাংকের আমানত নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আটকে আছে। ইতোমধ্যে চরম আস্থাহীনতায় পড়েছে। এর থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। টাকা-পয়সা আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here